Visits: 3

মোবাইল ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ভয়কে বলে ‘নোমোফোবিয়া’। ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে এটিকে একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অবশ্য এই সমস্যার কোনো আদর্শ সংজ্ঞা নেই। তবে ফেসবুক, টিকটকের এ যুগে তরুণদের মধ্যে এই সমস্যা একটি বাস্তবতা।

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক–শিক্ষার্থীর গবেষণায় দেখা গেছে, নোমোফোবিয়ার মতো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত এক-তৃতীয়াংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের মধ্যে সমস্যাটি সবচেয়ে প্রকট।

গবেষকদের মধ্যে আছে—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফোরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাজউদ্দিন শিকদার, একই বিভাগের শিক্ষার্থী ফিরোজ-আল-মামুন, মোহাম্মদ এ মামুন, মুক্তারুল ইসলাম, পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সালাউজ্জামান প্রধান, যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির মনোবিদ্যা বিভাগের মার্ক ডি গ্রিফিটস এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার পাবলিক হেলথ বিভাগের মোহাম্মদ মুহিত।

গবেষকেরা জানান, মোবাইল ফোনের সঙ্গে ব্যবহারকারীর মাত্রাতিরিক্ত মনঃসংযোগের অপর নাম ‘নোমোফোবিয়া’। নোমোফোবিয়া শব্দটি এসেছে নো (No) ; মো (Mobile) এবং ফোবিয়া (Phobia) থেকে। অন্যান্য দেশে বিশেষ এ আসক্তি নিয়ে গবেষণা হলেও বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য গবেষণা নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পড়ুয়া ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির ৫৮৫ জন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী শিক্ষার্থী এ জরিপে অংশ নেন।

গবেষকেরা জরিপের ভিত্তিতে দেখেছেন, জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মৃদু নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, মাঝারি নোমোফোবিয়ায় ৫৬ দশমিক ১০ শতাংশ এবং গুরুতর নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীর হার ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যান্য বর্ষের তুলনায় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নোমোফোবিয়ার মাত্রা বেশি।

এ ব্যাপারে গবেষক দলের একজন মোহাম্মদ এ মামুন বলেন, মৃদু ও মাঝারি নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবে যাদের গুরুতর অবস্থা তাঁদের জরুরি ভিত্তিতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত কি না সেটি নিশ্চিতে তিনটি বিষয় শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা—স্মার্টফোনে দৈনিক সময় ব্যয়, মনোচাঞ্চল্য বৃদ্ধিকারী পদার্থ সেবন বা ব্যবহার এবং প্রেম।

স্মার্টফোন আসক্তি, ফেসবুক আসক্তি, অনিদ্রা এবং বিষণ্নতার সঙ্গে নোমোফোবিয়া উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে বলে দেখেছেন তাঁরা। আর স্মার্টফোন আসক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে ফেসবুক আসক্তি এবং নোমোফোবিয়ার কারণ।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ওমানে একটি জরিপে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মাঝে মাঝারি ধরনের নোমোফোবিয়া ১৫ শতাংশ এবং চরম হারে এ সমস্যা রয়েছে ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীরা। ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেছে, ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ চরম ভাবে এবং ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ মাঝারি মাত্রায় আসক্ত। সৌদি আরবে চরম মাত্রায় ২২ দশমিক ১ শতাংশ এবং মৃদু মাত্রায় ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ।

স্মার্টফোনে বারবার কল বা মেসেজ চেক করার প্রবণতা, ঘুম ভাঙামাত্র ফোনটি খুঁজতে থাকা, সাক্ষাতে কথা না বলে ভার্চুয়ালি কথাবার্তায় ঝোঁক থাকা, সব জায়গায় স্মার্টফোন নিয়ে যাওয়া—এমনকি স্মার্টফোন নিয়ে টয়লেটে যাওয়া, ফোনটিকে কখনো সুইচ-অফ না করা, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই স্ক্রল করে যাওয়া, ফোনটি হারানোর ভয়ে থাকা—এসব বিষয়ও নোমোফোবিয়ার অন্যতম লক্ষণ বলে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।

এ ব্যাপারে গবেষণায় যুক্ত থাকা শিক্ষার্থী ফিরোজ-আল-মামুন বলেন, ‘সমস্যাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রকট আকার ধারণ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা দৈনিক বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করে, মাদক সেবন করে—অন্যদের তুলনায় তাদের মধ্যে এই সমস্যাটি বেশি।’

শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এ সমস্যার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের উপপরিচালক মনোবিজ্ঞানী শুভাশীষ কুমার চ্যাটার্জি বলেন, ‘যাদের বাস্তব জগতে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা কম, তাদের এসব আসক্তিতে পড়ার প্রবণতা বেশি। এই আসক্তির ফলে তাদের মানসিক চাপ বাড়ছে, রুটিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং রাত জাগার ফলে তাদের স্বাস্থ্য সমস্যাও বেড়ে চলছে। স্মার্টফোনের মতো ডিভাইসগুলোর ব্যবহার তো আমরা একেবারে বন্ধ করে দিতে পারি না। তবে যতটা সম্ভব কমানো যায় তাতেই ভালো।’

চলতি মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে হেলিয়ন বিজ্ঞান সাময়িকীতে গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে। হেলিয়ন একটি উন্মুক্ত বিজ্ঞান সাময়িকী। সূত্র: ajkerpatrika

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *