একজন মানুষ কয়েক সপ্তাহ ধরে বুকের অস্বস্তি অনুভব করছেন। কখনো শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কখনো মাথা ঘোরে, কখনো শরীর অস্বাভাবিক দুর্বল লাগে। পরিবারের সদস্যরা তাকে ডাক্তারের কাছে যেতে বলেন। তিনি প্রতিবার একই উত্তর দেন—
“আরও কয়েক দিন দেখি, হয়তো ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু তিনি জানেন, বিষয়টি শুধু ডাক্তারের কাছে যাওয়া নয়। চিকিৎসকের ভিজিট ফি দিতে হবে, কিছু পরীক্ষা করতে হতে পারে, ওষুধ কিনতে হবে। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে আবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে হতে পারে। প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
সীমিত মাসিক আয় দিয়ে সংসারের বাজার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর চিকিৎসার জন্য আলাদা অর্থ কোথায়?
তাই তিনি অপেক্ষা করেন।
কিন্তু রোগ অপেক্ষা করে না।
একসময় শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়। তখন দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। চিকিৎসা শুরু হয়, অর্থের ব্যবস্থা করতে আত্মীয়স্বজনের কাছে ফোন করা হয়। কেউ ধার দেন, কেউ সাহায্য করেন, কেউ সঞ্চয় ভেঙে দেন।
কিন্তু অনেক সময় ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
তারপর খবর আসে—তিনি আর নেই।
আমরা বলি, “হঠাৎ মৃত্যু।”
কিন্তু মৃত্যু কি সত্যিই সব সময় হঠাৎ আসে? নাকি দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত শারীরিক সংকেত, চিকিৎসা নিতে বিলম্ব, অর্থনৈতিক ভয় এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার পথ ধরেই মৃত্যু ধীরে ধীরে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়?
বাংলাদেশের বহু মানুষ শরীরে নানা রোগ বহন করেও সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যান না। এর পেছনে শুধু অসচেতনতা বা অবহেলা কাজ করে না; অনেকের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো চিকিৎসার খরচ।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ভাবলেই একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের মানুষের মনে একসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন আসে—
ডাক্তারের ভিজিট কত?
কী কী পরীক্ষা করতে হবে?
পরীক্ষার খরচ কত?
কত দিনের ওষুধ কিনতে হবে?
চিকিৎসা দীর্ঘ হলে সংসারের ব্যয় কীভাবে চলবে?
এই হিসাব করতে করতেই অনেক মানুষ চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন।
তারা বলেন—
“আরও কয়েক দিন দেখি।”
“হয়তো এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে।”
“এই মাসটা যাক, আগামী মাসে ডাক্তার দেখাব।”
কিন্তু রোগ মাসের বেতন পাওয়ার অপেক্ষা করে না।
অনেক রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে তুলনামূলক সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসা বিলম্বিত হলে রোগ জটিল হতে পারে, চিকিৎসার সময় দীর্ঘ হতে পারে এবং ব্যয়ও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ চিকিৎসার খরচ বাঁচাতে গিয়ে একজন মানুষ কখনো কখনো আরও বড় চিকিৎসা ব্যয়ের মুখে পড়েন।
শুরুর দিকে যে সমস্যার জন্য সাধারণ চিকিৎসা বা সীমিত পরীক্ষাই যথেষ্ট হতে পারত, পরে সেটির জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এতে শুধু রোগী নন, পুরো পরিবার মানসিক ও আর্থিক চাপে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে তখন পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়, ধার করতে হয় কিংবা প্রয়োজনীয় সম্পদ বিক্রি করতে হয়।
মাসিক বেতনভোগী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের অবস্থা অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন।
তারা নিয়মিত আয় করেন। কিন্তু সেই আয়ের বড় অংশ চলে যায় সংসারের বাজার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে।
মাসের শেষে নিজের চিকিৎসার জন্য আলাদা অর্থ রাখা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না।
তারা পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের অসুস্থতা গোপন করেন। পরিবারের সদস্যদের চিন্তামুক্ত রাখতে বলেন—
“আমি ভালো আছি।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে রোগ বাড়তে থাকে।
এই মানুষগুলো না সব সময় সরকারি সহায়তার আওতায় আসতে পারেন, না বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয় বহনের মতো আর্থিক নিরাপত্তা তাদের থাকে। ফলে তারা প্রায়ই চিকিৎসা ও সংসারের খরচের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অন্যতম শর্ত।
তাই একজন নাগরিক যদি চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে ভাবতে বাধ্য হন—“ডাক্তার দেখালে মাসের সংসার চলবে তো?”—তাহলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অর্থসংকটের নয়। এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সহজলভ্যতা, চিকিৎসা ব্যয়ের কাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন।
এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—
সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সেবা কতটা সহজে পাওয়া যায়?
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কি সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে?
জরুরি ওষুধ কি সব সময় সহজলভ্য?
রোগী কি চিকিৎসার সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান?
স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ বড় চিকিৎসা ব্যয়ের ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করবেন?
এই প্রশ্নগুলোর কার্যকর উত্তর ছাড়া স্বাস্থ্যসেবাকে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব বলা কঠিন।
চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমাতে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, কার্যকর ও জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
প্রথমত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, দক্ষ জনবল, মৌলিক পরীক্ষা এবং জরুরি ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রোগ নির্ণয় পরীক্ষার ব্যয় যৌক্তিক ও স্বচ্ছ করতে হবে। রোগী যেন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে গিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত না হন।
তৃতীয়ত, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার পরও ওষুধ কিনতে না পারলে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
চতুর্থত, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্যবিমা বা ঝুঁকি ভাগাভাগিভিত্তিক ব্যবস্থা বড় চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কা সামলাতে সহায়ক হতে পারে।
পঞ্চমত, চিকিৎসা ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। রোগী যেন জানতে পারেন কোন পরীক্ষা কেন প্রয়োজন, কোথায় তুলনামূলক কম খরচে মানসম্মত সেবা পাওয়া যায় এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য ব্যয় কত হতে পারে।
একজন মানুষ অসুস্থ হলে তার প্রভাব শুধু তার শরীরের ওপর পড়ে না। পরিবারের আয় কমে যেতে পারে, কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে, সন্তানদের পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে এবং পুরো পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতে পারে।
তাই স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসকের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানবিক উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
একটি পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে ঋণগ্রস্ত হলে তার প্রভাব বহু বছর ধরে চলতে পারে। তাই সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা শুধু জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজন নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও অংশ।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই না, যেখানে একজন সৎ কর্মজীবী মানুষ পরিবারের খরচ বাঁচাতে নিজের অসুখ লুকিয়ে রাখবেন।
আমরা এমন বাস্তবতা চাই না, যেখানে চিকিৎসার ব্যয়ের ভয় মানুষকে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগেই পরাজিত করে দেয়।
আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাই, যেখানে মানুষ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার সাহস পাবেন—খরচের আতঙ্কে চিকিৎসা পিছিয়ে দেবেন না।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো—একজন সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে তিনি কত দ্রুত, কত সহজে এবং কতটা সাশ্রয়ীভাবে মানসম্মত চিকিৎসা পান।
রোগের চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসার খরচের ভয়ও একটি গভীর সামাজিক সংকট।
এই সংকটের সমাধান শুধু একজন চিকিৎসকের হাতে নয়। রাষ্ট্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নীতিনির্ধারক, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে।
মানুষ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা বিলম্বিত না করেন—এটি দয়া নয়; এটি একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
মন্তব্য করুন