কেনো?? কিছু লোক ধনী হতে চায় না!

আবু আহমেদ:এমন লোক আছে কি, যে ধনী হতে চায় না! হ্যাঁ, আছে তো বটেই, তবে শুধু কিছু লোক নয়, অনেক লোকই। সত্য হলো, যত বিদ্যাবুদ্ধি মানুষ শিখেছে এবং শিখছে তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো অর্থ উপার্জন বা অন্তত ভালোভাবে বেঁচে থাকা। ভালো মানুষ হয়ে ভালো মানবীয় জীবন যাপন করা বিদ্যা অর্জনের অতি ছোট উদ্দেশ্য, বিদ্যা শিক্ষার অন্য লক্ষ্য হলো সমাজে নিজেকে তুলে ধরা, বিদ্যা ব্যবহার করে সমাজ থেকে তার মূল্য আদায় করা। সমাজ স্বীকৃতি বিদ্যা শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য কিন্তু বিদ্যাকে বেচে-ব্যবহার করে অন্যদের থেকে বেশি অর্থ উপার্জন করা। অর্থ দ্বারা কী হয়? এ প্রশ্নের জবাব প্রায় সবাই দেবে—অর্থ দ্বারা কী না হয়। অনেক লোকের কাছে এমন একটা কাজও বিশ্বে পাওয়া যাবে না, যা অর্থ দ্বারা অর্জন করা যায় না। অনেক লোক বলেন, প্রেম-ভালোবাসা অর্থ দিয়ে হয় না। আবার অনেকে বলেন, অর্থ ছাড়া এসবের মানে হয় না। যে প্রেম-পিরিতির কথা বলা হচ্ছে তথা যেথায় অর্থ কোনো প্রভাব বিস্তার করে না, সেটা অবুঝ লোকদের প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে শুধু সত্য। বয়সকালে ভালোবেসে কেউ ঘর ত্যাগ করেছে এমন শোনা যায় না। বয়সকালের ভালোবাসার মধ্যে সন্তান-সংসার বংশ ইত্যাদি বড় উপাদান হয়ে কাজ করে। একেবারে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তখনই হয়, যখন যে যাকে ভালোবাসছে তাদের কাছে কারোরই কোনো পিছুটান থাকে না। দুজনই যদি নিষ্কর্মের লোক হয়, অথবা একই সমতালের লোক হয়, তাহলে সেই ভালোবাসা টিকে ভালো।

জীবন পথে চলতে গেলে অনেক নতুন উপসর্গ এসে হাজির হয়, যারা অক্ষমতার সঙ্গে ওইগুলো সামাল দিতে পারে, তাদের ভালোবাসার জীবন টিকে যায়। জীবনে চলতে গিয়ে দুজনের মধ্যে যদি একজনেরও মনে স্বার্থপরতা প্রবেশ করে, তখন তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে। একদিন একজন ভেবেই বসল, একসঙ্গে থাকার যে মূল্য (Cost) তার থেকে বরং আলাদা থাকাই ভালো। বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই একটা কারণ খুঁজে পায়। তবে পরে দেখা যায় এমনও যে আগের কারণ থেকে পরে কারণ আরো অনেক বড়, তবুও জীবনকে একত্রে চালাতে হয়। কারণ তখন নতুন করে ভাবার যে আর সময় নেই। অর্থ অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে, সুখ কেড়ে নেয়। তবুও মানুষ অর্থের পেছনে ছুটে। অনেক লোক এই ছোটার মধ্যে মজা পায়। এভাবে ছুটতে না পারলে সে ভাবে নিষ্প্র্রাণ নিঃশেষ হয়ে যাবে। এই অর্থের পেছনে ছুটে চলেছে এমন সব লোক কখনো হিসাব করার সময় পাইনি যে তাদের কত অর্থ প্রয়োজন। তারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অর্থকে জমা করার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে চেয়েছে। এসব লোক অর্থপ্রবাহের পথগুলোকে ভালোভাবে চিনতে পেরেছে। তারা অর্থের স্রোতের প্রবাহের সঙ্গে না থাকতে পারলে ব্যর্থতার যন্ত্রণায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এমনও দেখা গেছে, অর্থ ছাড়া কী কী কাজ হয় বা অর্থ দ্বারা কী কী ক্ষতির কাজ হয়, তা ভাবার সময় তাদের হয়নি। তবে কিছু লোক আছে, তারা অর্থের ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। উদাসীনতা আবার দুই ধরনের। এক. অর্থের ব্যবহার না জানার কারণে, দুই. অর্থ অনর্থের মূল, এই ভেবে জমা করার ক্ষেত্রে উদাসীনতা।

আবার অল্পসংখ্যক লোক আছে, তারা ভাবে অর্থ তাদের সৃষ্টিকর্তার  (creator) ধ্যান-ধারণা থেকে দূরে নিয়ে যাবে। তারা ভাবে, অর্থের জন্য যে ভাবনা-সময় ব্যয় দরকার হয়, সেই ভাবনা-সময়টুকু তারা সৃষ্টিকর্তার ভাবনায় কাটালে তাদের অনেক কল্যাণ হবে। তাই অনেকের কাছে সষ্টিকর্তাকে পাওয়ার এবং অর্থকে পাওয়ার পরস্পরবিরোধী। তারা সজ্ঞানেই অর্থের পেছনে ছোটা বন্ধ করে দিয়েছে। একটা সন্তোষের জীবন তারা পেতে চেয়েছে অনেক অর্থ ছাড়াই। তবে বেশির ভাগ লোক মধ্যপন্থাই অবলম্বন করে। তারা ভাবে অর্থের প্রয়োজন আছে বটে, তবে একটা স্তর বা পরিমাণ পর্যন্ত। এরপর অর্থ সম্পদ না হয়ে বোঝা হয়ে দেখা দিতে পারে। উঁচু স্তরের অর্থ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ বাধাতে পারে। অনেক লোক সম্পদশালী হয় মা-বাবার সম্পত্তির ওয়ারিশ হয়ে। আবার কিছু লোক আছে, যারা ওয়ারিশির সম্পত্তির বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। তাঁরা বলছেন, ওই সব সম্পত্তি আমার অন্য ভাই-বোনেরা নিয়ে গেছে। আমি চাইতেও যাইনি। মহান আল্লাহ তো আমাকে ভালোই রেখেছেন। আসয়-বিষয় বা সহায়-সম্পদের ক্ষেত্রে উদাসীন অনেক লোক পাওয়া যাবে। তারা তাদের অবস্থানের ব্যাপারে কখনো দুঃখিত হয়নি। তবে দুঃখ পায় তখনই, যখন পরিবারের অন্য সদস্য তাদের উদাসীনতার কথা বলে খোঁচা দেয়। বহু লোক আছে যারা জীবনে অনেক পদ-পদবিতে ছিল, কিন্তু অর্থ জমানোর দিক থেকে তাদের অবস্থান অনেক তলানিতে। এরা কিন্তু তাদের অবস্থান নিয়ে খুশি। বরং গর্বও করে এই ভেবে যে অর্থ তাদের কখনো কলুষিত করতে পারেনি কিংবা অর্থ কখনো তাদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। এসব লোক বড় বড় পদ-পদবিতে ছিল নিজেদের কর্তব্য পালন করার জন্য, পারলে সমাজের উপকার করার জন্য। স্বল্পব্যয়ের মতো পদ-পদবিকে কখনো নিজ স্বার্থে, পরিবারের সদস্যের স্বার্থে ব্যবহার করেনি। পরিশ্রম-সততা এদের মহৎ করেছে। এসব লোক অনেকের কাছে বোকা হতে পারে কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী লোকদের কাছে এরা অনুকরণীয়। শিক্ষিত (educated) লোকটা যদি দুর্নীতিবাজ হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে সে সব সময় বড় দুর্নীতির খোঁজে থাকবে। এসব লোক নিজেদের আবার স্মার্ট ভাবে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে এরা পচা! এরা এতটাই মূর্খ যে এরা বুঝবেও না যে এরা পচে গেছে!

একজন জ্ঞানী লোক বলেন, অর্থ সুখ দিতে পারে না, অর্থ ভালো মন দিতে পারে না, অর্থ ভালো স্বাস্থ্য দিতে পারে না। হ্যাঁ, এ সবই তো সত্য, তবে অন্য সত্য হলো, এসব সৎ লোক সমাজে মেলে, যারা সরে আসতে পেরেছে অন্তত দুর্নীতি করে অর্থ উপার্জনের পথ থেকে, খুব কমসংখ্যক লোকই সরে আসতে পেরেছে। অনেক লোককে বলতে শুনি, অর্থের অভাবে অমুক ভালো লোকটা চিকিৎসা নিতে পারেনি। হ্যাঁ, এ কথায় প্রচ্ছন্ন একটা আক্ষেপ আছে, হয়তো চিকিৎসা নিলে ওই ভালো লোকটা সুস্থ হয়ে যেত। কিন্তু বিপরীতে এ-ও দেখা যায়, অনেক অর্থ থাকা সত্ত্বেও ওই ধনী লোকটা অনেক বেশি রোগকষ্টে ভুগে মারা গেছে। অর্থ তাকে ভালো চিকিৎসা দিয়েছে বটে, তবে আরোগ্য দিতে পারেনি। আর সে জন্যই অনেক সাদাসিধা লোক বলে যে সৃষ্টিকর্তা আমি যেন শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থ থাকি। আর সুস্থ থাকি এ জন্যই যেন আমি মনোযোগ দিয়ে তোমার ইবাদত করতে পারি। সৃষ্টিকর্তা এদের কথা শুনেছেন এবং এদের মধ্যে অনেকেই হাসপাতাল-ডাক্তার-ওষুধের সহায়তা ছাড়াই ভালোই আছে, থেকেছে এবং অতি সুস্থ অবস্থায় এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। অনেক লোক মনে করে, ধনী হওয়ার প্রচেষ্টার পেছনে কিছু পাপাচার থাকে, যেগুলো থেকে এরা দূর থাকতে চায়, যাদের নৈতিক অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়, তারা যেকোনো উপায়ে ধনী হওয়াকে শুদ্ধ মনে করে। জীবনে ধনী হওয়াকে তারা অন্যতম আরাধ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিছু লোক এমনও আছে ট্যাক্স  (Tax) দেওয়ার ভয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিজেদের ধন-সম্পদ স্থানান্তর করছে। এরা ধন চায়, তবে ট্যাক্স দিতে চায় না। আবার একই সমাজে এমন কিছু লোকও আছে, যারা শুধু বেশি ট্যাক্স দিতে হবে বলে বেশি অর্থ জমা করতে চায় না। ধনী হওয়ার যেমন কোনো সহজ পথ নেই, অনেককে বক্রপথে ধনী হতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সব হারিয়ে জেলে যেতে হয়েছে। মানুষকে ঠকিয়ে যারা ধনী হয়েছে, তাদের ধন বেশিদিন টেকেনি।

আবার এমনও কিছু লোক আছে, যারা ভাবে ধনী হলে অন্যদের নজরে পড়তে হবে, অন্যরা হিংসা করবে, সব সময় নিরাপত্তার অভাব অনুভব করতে হবে। তাই তারা ধনী হওয়া থেকে বিরত থাকে। আবার এহেন ভাবনা কাজ করে যে ধনী হলে আত্মীয়-স্বজন সব সময় তার থেকে কিছু আশা করবে। না দিলে অসন্তুষ্ট হবে। তাই এসব লোকের ট্যাক্সম্যানের ভয়ে, প্রতিবেশীর হিংসার কারণে এবং আত্মীয়দের ক্ষোভের কারণ হতে পারে—এসব ভেবে ধনী হতে চায় না। তারা ছোট এবং নীরব জীবনকে পছন্দ করে। অর্থের কারণে ওই সব লোক সালাম পেতে চায় না। তারা শুধু সালাম দিতে চায়।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পাদক ও প্রকাশক:এম.এস হাবিবুর রহমান

অফিস: শিকদার প্লাজা, লতাপাতা বাজার, কাপাসিয়া-১৭৩০, গাজীপুর । ফোন: ০১৭১১১১৩৮৫২,ই-মেইল: info@newssamahar.com