এম এস হাবিবুর রহমান
প্রকাশ : Jul 31, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: করণীয় ও বর্জনীয়




প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: করণীয় ও বর্জনীয়

সচেতনতা, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারে প্রযুক্তি হতে পারে উন্নয়নের কার্যকর হাতিয়ার


নিউজ সমাহার ডেস্ক: প্রযুক্তি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা, ব্যাংকিং, প্রশাসন, সংবাদ ও বিনোদন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ এখন দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, দূরবর্তী যোগাযোগ, অনলাইন শিক্ষা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করতে পারছে।

তবে প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করে কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহার মানুষের সময়, শ্রম ও ব্যয় কমাতে পারে। অন্যদিকে অসতর্ক, অতিরিক্ত বা অনৈতিক ব্যবহার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সামাজিক সম্পর্ক, মানসিক সুস্থতা ও আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর নিরাপদ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার কেন জরুরি

প্রযুক্তি মানুষের কাজকে সহজ ও দ্রুত করেছে। শিক্ষার্থীরা অনলাইনভিত্তিক পাঠ, ডিজিটাল বই ও শিক্ষামূলক উপকরণ ব্যবহার করে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। কৃষকেরা আবহাওয়া, বাজারদর ও কৃষিবিষয়ক তথ্য জানতে পারছেন। ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারছেন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবাও ক্রমে ডিজিটাল মাধ্যমে সহজলভ্য হচ্ছে।

তবে ইন্টারনেটে পাওয়া সব তথ্য নির্ভুল নয়। যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য অসতর্কভাবে প্রকাশ করলে প্রতারণা বা তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার পড়াশোনা, কাজ, ঘুম ও পারিবারিক যোগাযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার পাশাপাশি সচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের করণীয়

প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে প্রযুক্তি ব্যবহার

প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। শিক্ষা, কাজ, গবেষণা, যোগাযোগ, ব্যবসা বা প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সময়ের কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হয়।

অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় না করে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রযুক্তি যেন কাজের সহায়ক হয়, সময় নষ্টের কারণ না হয়—সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি।

তথ্য যাচাই করে শেয়ার করা

ইন্টারনেটে পাওয়া কোনো সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা তথ্য দেখেই তা সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। তথ্যের উৎস, প্রকাশের সময়, প্রাসঙ্গিকতা এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন, দুর্যোগ ও জননিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই ছাড়া প্রচার করা উচিত নয়। ভুল তথ্য অনিচ্ছাকৃতভাবে শেয়ার করলেও তা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা

পাসওয়ার্ড, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, কার্ডের নম্বর, এককালীন যাচাইকরণ কোড বা ব্যক্তিগত নথি অপ্রয়োজনে কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়।

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা ভালো। সম্ভব হলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা দ্বি-স্তরীয় যাচাইকরণ চালু রাখা যেতে পারে।

শিশু ও কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দিকনির্দেশনা দেওয়া

শিশুদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানো জরুরি। অভিভাবকদের উচিত বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে খোঁজ রাখা।

শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে শিশুদের সঙ্গে আলোচনা করা বেশি কার্যকর হতে পারে। অনলাইন গোপনীয়তা, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সচেতন করা প্রয়োজন।

প্রযুক্তিকে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের কাজে ব্যবহার

অনলাইন কোর্স, শিক্ষামূলক ভিডিও, ডিজিটাল বই ও প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রযুক্তি ব্যবহারকে শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শেখা, গবেষণা ও সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।

অনলাইনে শালীন ও দায়িত্বশীল আচরণ করা

অনলাইনেও মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে সম্মান করা প্রয়োজন। মতের ভিন্নতা থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান, বিদ্রূপ বা হয়রানি থেকে বিরত থাকা উচিত।

কোনো ব্যক্তির ছবি, ভিডিও, ব্যক্তিগত তথ্য বা কথোপকথন অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা অনুচিত। ডিজিটাল মাধ্যমেও ভদ্রতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা জরুরি।

সফটওয়্যার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা হালনাগাদ রাখা

মোবাইল, কম্পিউটার এবং ব্যবহৃত অ্যাপ বা সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ করলে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা উন্নত হতে পারে। বিশ্বস্ত উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা এবং অপ্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়ার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের বর্জনীয়

যাচাই ছাড়া গুজব বা তথ্য প্রচার করা যাবে না

আবেগঘন বা চমকপ্রদ কোনো তথ্য দ্রুত শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। কোনো তথ্য বহুল প্রচারিত হলেই তা সত্য—এমন ধারণা গ্রহণ করা ঠিক নয়।

ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য প্রকাশ করা যাবে না

পাসওয়ার্ড, ব্যাংক তথ্য, যাচাইকরণ কোড বা পরিচয়পত্রের সংবেদনশীল তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত নয়। অপরিচিত ব্যক্তি বা সন্দেহজনক বার্তার অনুরোধে এসব তথ্য দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অতিরিক্ত ও উদ্দেশ্যহীন প্রযুক্তি ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে

দীর্ঘ সময় অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং, অনলাইন গেম বা বিনোদনে ব্যয় করলে কাজ, পড়াশোনা, ঘুম ও পারিবারিক সময় ব্যাহত হতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

সাইবার হয়রানি বা অপমানজনক আচরণ করা যাবে না

অন্যকে ভয় দেখানো, অপমান করা, বিদ্রূপ করা, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করা বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

অনুমতি ছাড়া অন্যের ছবি বা তথ্য ব্যবহার করা যাবে না

কোনো ব্যক্তির ছবি, ভিডিও, বক্তব্য বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের আগে প্রয়োজনীয় সম্মতি নেওয়া উচিত। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ছবি বা তথ্য প্রকাশে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

সন্দেহজনক লিংক ও অজানা অ্যাপ ব্যবহার করা যাবে না

অপরিচিত উৎস থেকে পাওয়া লিংকে ক্লিক করা, অজানা অ্যাপ ইনস্টল করা বা অপ্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়া নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কোনো অফার বা বার্তা অস্বাভাবিক মনে হলে তা যাচাই করা উচিত।

প্রযুক্তিকে প্রতারণা বা ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করা যাবে না

ভুয়া পরিচয় তৈরি, আর্থিক প্রতারণা, তথ্য বিকৃতি বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার কাজে প্রযুক্তি ব্যবহার করা অনৈতিক ও ক্ষতিকর। প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে সম্মান করেই হওয়া উচিত।

পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার গড়ে তুলতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিজেরাও দায়িত্বশীল ব্যবহারের উদাহরণ তৈরি করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার শেখালেই যথেষ্ট নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই, অনলাইন শিষ্টাচার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।

প্রযুক্তি ব্যবহারে ভারসাম্য জরুরি

প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার সীমাহীন নির্ভরশীলতাও সমাধান নয়। প্রয়োজন সচেতন, নিরাপদ, নৈতিক ও উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবহার।

প্রযুক্তি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মানুষের বিবেক, বিচারবোধ ও দায়িত্বশীলতার বিকল্প নয়। কোনো তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া গেছে বলেই তা নির্ভুল—এমন ধারণা গ্রহণ করা ঠিক নয়।


প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর সঠিক ব্যবহার শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা ও জনসেবায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে অসচেতন, অনৈতিক বা অতিরিক্ত ব্যবহার ব্যক্তি ও সমাজের জন্য বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—তথ্য যাচাই করা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা, অনলাইনে শালীন আচরণ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা।

প্রযুক্তি হোক জ্ঞান, দক্ষতা ও উন্নয়নের হাতিয়ার—অসচেতনতা, বিভ্রান্তি ও অপব্যবহারের মাধ্যম নয়।

আপনার মতে প্রযুক্তির নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের কী ভূমিকা থাকা উচিত? মতামত লিখুন মন্তব্যের ঘরে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সরকারের পাওনা ১২৬ কোটি টাকা, ফাঁকি দিতে অভাবনীয় জালিয়াতি ওসম

1

বৃহত্তর খুলনার প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্রজলাল কল

2

বিসিসির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করল নির্বাচন কমিশন

3

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

4

বিশ্বকাপ নিয়ে রিভালদোর সঙ্গে তর্কে জড়ালেন নেইমার

5

মুক্তমত প্রকাশ–সংক্রান্ত ও গায়েবি মামলা ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্

6

ট্রাম্প ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন, প্রথম দিনেই সই করবেন রেকর্ডসংখ্য

7

গ্রামের দৃশ্য

8

‘আমি ভয়ও পাচ্ছি, কারণ ইসরায়েলিদের বিশ্বাস করি না’

9

কোনো সভ্য দেশে কূটনৈতিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা হতে পারে না

10

সাঁতার প্রতিযোগিতার সেরা নাফিসা সিনেমায় নায়িকাও, নায়কের তালি

11

এআইয়ের কারণে নয়, চাকরি হারাবেন নিজেকে আপগ্রেড না করলে

12

কাতারে বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের নতুন সভাপতি শামীম সম্পাদক সালা

13

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

14

একটি শক্তিশালী মাল্টিমিডিয়া নিউজরুম কেমন হওয়া চাই

15

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

16

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

17

সাংবাদিকদের দ্রুত অ্যাক্রিডিটেশন প্রদানের আহ্বান অনলাইন এডিট

18

প্রধান উপদেষ্টাকে মার্চে বেইজিং সফরে নিতে আগ্রহী চীন

19

আমি এমন-ই!– মামুনুর রশিদ।

20