কবি ও কবিতা  

মতামত শিল্প-সাহিত্য

কবি আর কবিতা একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। সবার মাঝে কবিতা বাস করে। কেউ প্রকাশ করে, কেউ করে না। কবিতা নিজের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার বিষয় নয়। এটি ছড়িয়ে দেবার। যুগ যুগ ধরে কবিরাই বর্তমানকে টেনে নিয়েছে ভবিষ্যতের দোড় গোড়ায়। প্রাচীনকাল থেকে সমকালীন প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা-বোধ, সমাজচিত্র সুক্ষ্মভাবে ধারণ করেছেন বলেই বর্তমানে বসে আমরা সে বিষয়গুলো জানতে পারছি। কবি না থাকলে কবিতার জন্ম হয় না। অন্যদিকে কবিতা না থাকলে কাউকে কবি বলা যায় না।

কবি বর্তমান সময়কে তাঁর কথা ও কাব্যের ছন্দে মহাকালে পৌঁছে দিতে পারে। তিনি সত্য সৃজন করেন। কারো ভয়ে ভীত হন না। তিনি সমাজের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ, মত প্রকাশে স্বাধীন। কবি শোষণের বিরুদ্ধে লিখে যান। সময় বিশেষে কোন একটি বিশেষ বিষয়কে অবলম্বন করে কবির আনন্দ বেদনা যখন প্রকাশের পথ পায় তখনই কবিতার জন্ম। কবি জগতের ভালো মন্দের যথাযথ চিত্র অঙ্কন করবেন। কবিতা শিল্প সাহিত্যের আদিমতম শাখা।

কবি ও কবিতা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। কবিতা হলো ছন্দবদ্ধ রচনা। কবিতা দিয়ে ভালোবাসা আদায় করা যায়। কবির হৃদয়ে কল্পনা এবং কল্পনার ভেতরের চিন্তা মানব মনের অলিতে গলিতে বিচরণ করে। কবি হতে হলে অগাধ জ্ঞানসম্পন্ন হতে হয়। ছন্দ লয় তাল অলংকার ইত্যাদি না জেনে তা সম্বন্ধে জ্ঞানার্জন না করে অধীত বিদ্যার দ্বারা কাব্যচর্চা করতে যাওয়া আত্মহত্যার শামীল। একজন প্রকৃত কবির পুঁথিগত বিদ্যা বা ব্যাকরণ সম্বন্ধে প্রাথমিক জ্ঞান না থাকলে তিনি সত্যিকারের কবি হয়ে উঠতে পারবেন না। কবিতার নিজস্ব ব্যাকরণ রয়েছে, তা ভালো করে জেনে তা মেনে কবিতা লিখতে হবে। নিজের বৃত্তকে অতিক্রম করতে হবে। জ্ঞান ও অভিজ্ঞার সম্ভারে কবিতার ভেতরের শক্তি বৃদ্ধি পায়। অনেক গুণের সম্ভারে কবি হয়ে ওঠেন সর্বজনীন।

কবি হতে হলে পড়তে হয়, কবিতাকে ভালোবাসতে হয়। বুকে লালন করতে হয়। কবি নিজেকে অতিক্রম করে যাবেন। যিনি শুধু নিজের কথাই নয় সমগ্র মানব জাতির কথা কবিতায় ফুটিয়ে তুলবেন। নিজের লেখাতে শুধু নিজের অনুভূতিই নয় তিনি অন্যের অনুভূতিকে বুঝে তা প্রকাশ করেন। নিজের ও নিজের সৃষ্টির মাঝে দূরত্ব স্থাপন করেন। কবিকে সার্বজনীন হতে হবে, কোনো গোষ্ঠী বা ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ হলে চলবে না। গ্রিক দার্শনিক এরিষ্টটল বলেছেন, ‘কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি. ইতিহাসের চেয়ে বড়’’। তিনি কবিতা বলতে মানুষের গভীর ভাবনার প্রকাশ ও তার বিশালতার কথা বলেছেন। জন কীটস কবিতা সম্পর্কে বলেন- শুধু ছন্দে ও অন্ত্যমিলে কোনো কিছু লিখলেই সেটা কবিতা হবে না। কবিতা পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটবে এবং নিজের ভাবনাগুলো কবিতায় খুঁজে পাবে। কবি এডগা এলান বলেন কবিতা হলো সৌন্দর্যের ছন্দময় সৃষ্টি। কবিতা চির রহস্যময় জানার মাঝে অজানায় ভ্রমণ। দৃশ্যমান যা কিছু এবং অনুভব ও কল্পনা করে যা সৃষ্ট হয় তাই কবিতা। কবিতায় থাকে সমকালের স্মৃতি, সমকালের মধ্য দিয়ে সে মহাকালকে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের ভাবনায় বিচরণ করে। কবিতা অনুভূতির মধ্য থেকে জন্ম নেয়।

কবিতায় ভাষার নতুনত্ব কারুকাজ থাকতে হবে। ছন্দ তাল থাকতে হবে। সমসাময়িকতা থাকতে হবে। প্রকৃত জাত উপাদান নিয়ে লিখতে হবে। প্রকৃতিই কবিতার উপকরণের অফুরন্ত ভা-ার। প্রকৃতি কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। এই উপকরণ নিয়ে কে কিভাবে বিন্যাস করলো সেটাই দেখার বিষয়। কবিতা হলো বিশুদ্ধ শব্দের নির্মাণ। কবি অতি যতেœ শব্দ প্রয়োগ, শব্দের আধুনিকতা, শব্দে শব্দে ছন্দে ছন্দে মালা গাাঁথেন। প্রতীক উপমা রূপক ব্যবহারে চমকপ্রদ ছবি এঁকে বিশুদ্ধ কবিতা নির্মাণ করেন। যে কবি যত বেশি ছন্দ যানেন তার কবিতা হয় ততো মাধুর্য্যপূর্ণ। কবিতার মাঝে গতিশীলতা বা প্রবহমানতা থাকতে হবে, যা পাঠককে আকৃষ্ট করে। কোন শব্দ বা বাক্য কানে লাগে কি না সেদিকে লক্ষ্য রাখেন। কবিতায় উপমা থাকবে,  গল্পের মতো চোখের সামনে ছবি ভেসে উঠবে কবিতা পাঠে।

সব হৃদয়েই লুকিয়ে আছে কবি সত্ত্বা। যিনি কবিতা লেখেন তিনিই কবি। জীবনানন্দ দাস তাঁর ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে লিখেছেন- সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি। কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য বিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না। যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়। অর্থাৎ কল্পনাপ্রবণ ও আবেগী না হলে কাব্য সৃষ্টি করা যায় না। এটা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে কবিদের প্রতি বিশেষ নেয়ামত।

কবি একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট, ঘটনাকে রূপকধর্মী ও নান্দনিকতায় কবিতায় রূপ দেন। শব্দ নিয়ে খেলেন তিনি। শব্দ নিয়ে খেলতে খেলতে দৈনন্দিন জীবনের গদ্যময় শব্দমালাও পদ্যময় হয়ে ওঠে। সেই সাথে শিখতে হয় ছন্দের ভেতর ও বাহির। আইন না জানলে কখনোই আইন ভাঙার আনন্দ পাওয়া যায় না। কবি যখন কবিতা লিখবেন তখন সাতন্ত্রবোধ থাকতে হবে। কবিতা এমনভাবে উপস্থাপিত হবে যা অন্যের সাথে মিলবে না। নতুন তরতাজা ভিন্ন স্বাদের। লেখার বিষয়বস্তু হবে আকর্ষণীয়। কবিতার শব্দ আমাদেরকে কল্পনার রাজ্যে স্বপ্ন জাগিয়ে দেয়।

কবির মাঝে লুকিয়ে আছে এক দেশ প্রেমিক, প্রকৃতি প্রেমিক, মানব সেবক, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, গবেষক, পথ প্রদর্শক। অন্য কোনো পেশার মানুষকে এমনভাবে দেখা যায় না মানুষকে আলোর পথে ডেকে নিয়ে যায়। সকল গুণের মিশ্রণে কবি। তিনি অবিচলিত থাকেন। সকল সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে তিনি মনের মাধুরী দিয়ে বিষয়কে উপস্থাপন করেন। কবি এতো গুণ অর্জন করে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। প্রকৃত দেশপ্রেম না থাকলে স্বতঃস্ফুর্তভাবে স্বদেশপ্রেমের কবিতা লেখা যায় না। মনুষত্বের আলো, মানবপ্রেমের আলো মানুষের অন্তরে জ্বেলে যান। কবির কবিতা হবে পাঠকের মনকে পরিশুদ্ধ করার হাতিয়ার। তার লেখা হবে জীবন্ত, প্রাণবন্ত, যুগ যুগান্তর অতিক্রম করে মহাকালকে ছাপিয়ে যাবে।

মানব সভ্যতার রূপায়নে কবি ও কবিতা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানব মনন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। কবির কবিতা যেন অনর্থক ও ভ্রান্ত উদ্দেশ্যে প্রণোদিত না হয়। কাঠামোর বিচারে কবিতা বিভিন্ন রকম হয়। যুগে যুগে কবিরা কবিতার বৈশিষ্ট্য ও কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছেন। কবিতার ভিন্ন ভিন্ন রূপগুলোই বর্তমানে কবিতার বিভিন্ন শাখায় পরিণত হয়েছে। কবিতাকে ছকে বেঁধে রাখা যায় না। শৃংখলিত করা যায় না। কবিতা চিরকালীন উন্মুক্ত এক বিষয়। প্রবাহমানতার মধ্য দিয়ে ক্রমাগত চলতে থাকে।

লেখক- কামরান চৌধুরী, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *