গাজীপুরে রিজার্ভের অব্যাহত পতন ও উত্তরণের উপায় বিষয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

মোহাম্মদ মনজুরুল হক গাজী :  গাজীপুরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অস্থিতিশীলতা এবং রিজার্ভের অব্যাহত পতন ও উত্তরণের উপায় বিষয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যা ৭ টায় শহরের জয়দেবপুর ক্লাবের রোটারি মিটিং রুমে রোটারি ইন্টারন্যাশনালের- রোটারি ক্লাব অব গাজীপুরের উদ্যোগে ও সহায়তায় দেশের অর্থনৈতিক এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
রোটারি ক্লাব অব গাজীপুরের প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম গাজীর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রোটারি ডিস্ট্রিক্ট গভর্নরের প্রধান উপদেষ্টা ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন। বিষয়টির আলোচক হিসেবে ছিলেন রোটারি ক্লাব অব গাজীপুরের পাস্ট প্রেসিডেন্ট-এসিস্ট্যান্ট গভর্নর-মাস কয়েক আগে প্রয়াত নুরুল ইসলাম ভাওয়াল রত্নের পুত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক খালেদ মাহবুব মোর্শেদ (কাজল)। বি’বি’র ডাইরেক্টর খালেদ মোর্শেদ মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে তার আলোচনাটি চমৎকারভাবে গাজীপুরের রোটারিয়ানদের সামনে উপস্থাপন করেন।

••তিনি বলেন— উন্নয়ন হচ্ছে কোন কিছুর ইতিবাচক পরিবর্তন অর্থাৎ পূর্বের অবস্থা হতে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে উন্নীত হওয়াকে উন্নয়ন বলা হয়। এক সময় উন্নয়ন বলতে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই বুঝাতো, কিন্তু বর্তমানে উন্নয়ন বলতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশগত উন্নয়ন,ব্যক্তি উন্নয়ন, রাষ্ট্র উন্নয়নকেও বুঝানো হয়। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বুঝা যাবে– অধিক কর্মসংস্থান হলে, অধিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধা সৃষ্টিতে,সামগ্রিক জীবনমানের উন্নতিতে, উচ্চ ভোগ, উচ্চ সঞ্চয়, উচ্চ বিনিয়োগ ও আমদানি রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধির অবস্থা দেখে।
দেশের মানব উন্নয়ন বুঝা যায়—মানুষের মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু ,মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি ,দারিদ্র্যতার হার হ্রাস, চিকিৎসা সেবার মাথাপিছু খরচ, মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস এগুলো দেখে ।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাগুলো হচ্ছে– উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভের পতন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি, দেশ থেকে অর্থ পাচার, তারল্য সংকট, নিম্নমুখী বৈদেশিক বিনিয়োগ ইত্যাদি অন্যতম।
বর্তমানে সরকার গৃহীত বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে বৃহৎ প্রকল্পসমূহ হলো— ৩০,১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু, ১৭,৭৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মাদারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, ২১,৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা মেট্রোরেল, ৩৯,২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা রেল লিংক রোড,২১,৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩য়  টার্মিনাল নির্মাণ, ৮,৯৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণসহ আরো কিছু উন্নয়ন প্রকল্প।
জনাব মোর্শেদ রিজার্ভের আলোচনায় বলেন, ••••রিজার্ভ বলতে বুঝায় একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা মুদ্রা বিষয়ক কর্তৃপক্ষের কাছে  বৈদেশিক মুদ্রার গচ্ছিত সম্পদের মজুদকে। উক্ত গচ্ছিত বৈদেশিক মুদ্রা প্রধানত রাষ্ট্রের আমদানি মূল্য ও বৈদেশিক ঋণ ইত্যাদি পরিশোধে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ ২০২১ থেকে এ পর্যন্ত (২০২৩) রিজার্ভের অব্যাহত পতনের মধ্যে রয়েছে। তবে ২০০৬-২০০৭,২০১৪-১৫,২০১৯-২০ অর্থবছরে রিজার্ভের উত্থানের মধ্যে অবস্থান করছিলো দেশ।
রিজার্ভের পতনের আলোচনায় তিনি ২৮ টি কারণ উল্লেখ করেন। এর উল্লেখযোগ্য কারণগুলো  হলো— বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে আমদানি ব্যয়ের উর্ধ্বমুখীতা, জ্বালানিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হতে অব্যাহত ডলার বিক্রি, সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ঋনের কিস্তি পরিশোধে ( টাকার অবমূল্যায়নে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে), বৈদেশিক বিনিয়োগের নিম্নমুখীতা, ব্যাপক অর্থ পাচার, বৈদেশিক অনুদান ছাড়করনের নিম্নমুখীতা, অস্বাভাবিক হুন্ডি,রপ্তানি আয় বিদেশ হতে দেরিতে প্রেরণ, বেড়ানো- চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি, জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও দেশে রেমিট্যান্সের নিম্নমুখীতা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অভাব, পদ্মা সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব কোরিয়ান-চীনা কোম্পানি পাওয়ায় তারা তাদের পাওনা নিজ দেশে ডলারের মাধ্যমে নিয়ে যাচ্ছে, বৈদেশিক ঋণ-সাহায্য- অনুদান হ্রাস।।

তিনি আলোচনায় রিজার্ভ পতনের ২২টি  প্রভাব বা ফলাফলের কথা উল্লেখ করেন।

রিজার্ভর পতন ঠেকাতে বা উত্তরণের উপায় বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন রিজার্ভের পতন রোধে ইতিমধ্যে ১৪ টি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি, আমদানি নিরুৎসাহিতকরণে এলসি মার্জিন বৃদ্ধি করা, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি এলসি মনিটরিং করছে, সাইড এলসি এর পরিবর্তে ডেফার্ড এলসি উৎসাহিত করা, রেমিট্যান্স প্রেরণে পৃথক মোবাইল অ্যাপস চালু করা, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি ব্যতীত অন্য পণ্যের এলসি খোলা নিরুৎসাহিত করা উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া রিজার্ভ শক্তিশালীকরণে ১৩ টি  মধ্যমেয়াদী ও ১৩ টি দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনার কথা তিনি উল্লেখ করেন। যেগুলোর মধ্যে  অন্যতম হলো আমদানি বিকল্প উৎস সৃষ্টি করা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে শর্ত সহজীকরণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে উদ্যোগ গ্রহণ, পুঁজিবাজারে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে উদ্যোগ, ডলারের বাজারভিত্তিক দাম নির্ধারণ, ব্যক্তি পর্যায়ের বৈদেশিক মুদ্রা নগদ ধারণের ক্ষেত্রে এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট-১৯৪৭ এর প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ, বৈদেশিক অনুদান ছাডকরণে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করা, অর্থ পাচার রোধে শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান, রিজার্ভ থেকে ঋণ না দেওয়া, রেমিটারদের বিভিন্ন নন ক্যাশ প্রনোদনা সুবিধা প্রদান, আমদানিকৃত তেলের উপর চাপ কমাতে নতুন গ্যাস কূপের অনুসন্ধান করা,পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা।
এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি– গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ে তথ্য বহুল এমন চমৎকার একটি প্রবন্ধ গাজীপুরের রোটারিয়ানদেরকে উপহার দেওয়ায় রোটারিয়ান নেতা এবং ব্যাংকার খালেদ মাহবুব মোর্শেদ কাজলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং তার পেশাগত জীবনে সর্বোচ্চ পদায়ন কামনা করেন।
আলোচনা অনুষ্ঠানটিতে রোটারি ক্লাব অব গাজীপুরের অন্যান্য রোটারিয়ান নেতৃবৃন্দ এবং রোটারিয়ানবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।