ক্ষমতাই কি দূর্নীতিকে নিরাপদ করে?

গত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমগুলোতে বড় বড় শিরোনামে প্রকাশিত হচ্ছে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে আসীন ব্যক্তিদের অবৈধ পথে সম্পদের পাহাড় গড়ার পিলে চমকানো সব খবর। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের অবৈধ পথে অঢেল সম্পদ অর্জনের হিসাবও গণমাধ্যমের কল্যাণে জানা যাচ্ছে। বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের ১১৯টি দলিলের সম্পদসহ নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার সম্পদ ক্রোকের নির্দেশনা দিয়েছেন মহামান্য আদালত।

আমরা এমন একটা দেশে বাস করছি, যে দেশে পুলিশের সাবেক প্রধান থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের চাকরিজীবী, রাজনীতিক, পেশাজীবী, আইন প্রণেতাসহ বহু লোক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। দেশের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত একশ্রেণির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা জনগণের সম্পদ লুটে নিয়ে দুর্নীতির কলঙ্কিত অধ্যায় তৈরি করে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ে নিয়োজিত থেকে কেউ যদি এতটা দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তাহলে তার অধস্তনদের অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। নিজে অনৈতিক কাজ করে আর যাই হোক নীতিকথা বলা যায় না। মানুষের সবচেয়ে বড় আদালত তার বিবেক। সেই বিবেকের কাছে তো কেউ পার পাবে না। একজন সরকারি চাকরিজীবী কত টাকা মাইনে পান, তা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। জানা যায়, বেনজীর আহমেদ তার চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা বাবদ আয় করেছেন আনুমানিক ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার মতো। অথচ তিনি গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় চারটি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক, চারটি শতভাগ কোম্পানির মালিকানা, ১৫টি কোম্পানির আংশিক মালিকানা, চারটি বিও অ্যাকাউন্টসহ ৩৩টি অ্যাকাউন্ট করেছেন, যা আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া গোপালগঞ্জে দৃষ্টিনন্দন সাভানা ইকো রিসোর্ট, গোপালগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশে শত শত বিঘা জায়গা-জমি, পূর্বাচলে ৪০ কাঠার উপর ডুপ্লেক্স বাড়িসহ তার অঢেল সম্পদের কথা জেনে এদেশের সাধারণ মানুষ বিস্মিত ও হতবাক। এসব অর্থ-সম্পদ বৈধ করার জন্য তিনি স্ত্রী-সন্তানের নামে বিনিয়োগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অর্থ-সম্পদ ছাড়াও অনেক কুকীর্তির খবর আগেও প্রচারিত হয়েছে; কিন্তু এগুলোর সত্যতা সম্পর্কে মানুষ নিশ্চিত ছিলেন না।

আমাদের দেশের একটি সংস্কৃতি হচ্ছে, যখন ক্ষমতায় বা উচ্চপর্যায়ে কেউ নিয়োজিত থাকেন, তখন অনেকে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তোষামোদি করে তার দোষত্রুটিগুলোকে আড়াল করে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে, বাহবা দেয়। কিন্তু ক্ষমতা থেকে সরে গেলে আর ফিরেও দেখে না। যারা এতদিন কাউকে প্রশংসার জোয়ারে ভাসাত, তারাই তখন তার অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সরব হয়ে ওঠে। এসব জানার পরও আমরা সচেতন হই না।

আসলে ক্ষমতা এমনই এক শক্তি, যার কারণে অধিকাংশ মানুষ মোহাবিষ্ট হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। ভুলে যায় ক্ষমতা চিরদিন থাকে না, এটি খুব সাময়িক। শুধু ক্ষমতা নয়, মানুষের জীবনটাই তো স্বল্প সময়ের। এই এক জীবনে একজন মানুষের কত অর্থ-সম্পদ প্রয়োজন? একজন হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ কেন, কার জন্য অর্জন করেন? নিজের আরাম-আয়েশের জন্য? কিংবা ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য? অভিভাবক হিসাবে সন্তানের ভবিষ্যৎ দেখার দায়িত্ব পিতামাতার। কিন্তু সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত না করে নিজে অবৈধ পথে বিত্তবৈভবের মাঝে সন্তানদের রেখে গেলে এর জন্য জবাবদিহি সন্তান করবে না, করবে সেই পিতামাতা। তাছাড়া দেখা গেছে, এসব সন্তান কখনো পিতামাতার বাধ্য তো হয়ই না, মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া-খায়েরও করে না। এটাই বাস্তব সত্য।

আসলে দুর্নীতি আমাদের সমাজটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। এমন কোনো খাত নেই, যেখানে দুর্নীতি নেই। নীতি, নৈতিকতা, আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ সমাজ থেকে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দেশে একদিকে নিরন্ন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে ধনিক শ্রেণি ফুলে-ফেঁপে উঠছে। রাস্তায় নতুন নতুন মডেলের গাড়ি আর শপিং মলে উপচে পড়া ভিড় দেখে মনে হয় না এদেশে কোনো দরিদ্র মানুষ আছে। দুর্নীতির কারণেই শ্রেণিবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। সম্পদশালীরা কি একবারও ভেবে দেখেছেন, তারা জনগণের অর্থ-সম্পদ লুটে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে কতদিন সুখের সাগরে ভাসতে পারবেন?

এসব নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। দুর্নীতিবাজদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ ক্রোক করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সমাজ থেকে দুর্নীতি কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত বর্তমানে আলোচিত এ বিষয়গুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া।

লেখক :মনজু আরা বেগম ; অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

monjuara2006@yahoo.com