জেনে নিন মাটিতে বসে খাওয়ার উপকারিতা ও নিয়ম

মেঝে বা মাটিতে বসে খাওয়া সুন্নত। আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সা.) মানব জাতিকে খাওয়া দাওয়ার সকল প্রকার সভ্যতা, নিয়ম কানুন শিক্ষা দিয়েছেন। তারমধ্যে রয়েছে মাটিতে বসে চামড়ার দস্তরখানা বিছিয়ে খাওয়া। উচু স্থানে বসে এবং হেলান দিয়ে না খাওয়া নিষেধ করেছেন। কালের বিবর্তনে আমাদের মধ্যে পশ্চিমাদের সংস্কৃতি প্রবেশ করায় সেই আদর্শ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। বেশিরভাগ মানুষ এখন চেয়ার টেবিলে বসে খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য ভালো রাখতে মেঝে বা মাটিতে বসে খাওয়ার অভ্যাস করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
চলুন জেনে নেই এই সুন্নত মুবারকের বহুমুখী উপকারিতা। এসব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো এখানে।
ডান হাত দিয়ে খাওয়া
আল্লাহর রাসুল (সা.) সারাজীবন ডান হাত দিয়ে খাবার খেয়েছেন। ডান দিয়ে খেতে আদেশ দিয়েছেন এবং বাম হাতে খেতে নিষেধ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বাম হাত দ্বারা খাবার খেয়ো না ও পান করো না। কেননা শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩৭৬; মুসলিম, হাদিস : ২০২২)
বিসমিল্লাহ পড়তে ভুলে গেলে
খাবার খাওয়া শুরু করার আগে বিসমিল্লাহ পড়া সুন্নত। কিন্তু কেউ যদি ভুলক্রমে বিসমিল্লাহ পড়া ছাড়া খাবার খেতে শুরু করেন, তাহলে তার করণীয় কী? আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, “যখন তোমরা খানা খেতে শুরু করো তখন আল্লাহর নাম স্মরণ করো। আর যদি আল্লাহর নাম স্মরণ করতে ভুলে যাও, তাহলে বলো, ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওআখিরাহ। ” (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৭৬৭, তিরমিজি, হাদিস : ১৮৫৮)
পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া
খাবার খাওয়ার সময় কদাচিৎ খাবার পড়ে যেতে পারে। আবার কখনো-সখনো থালা-বাসন থেকেও এক-দুইটি ভাত অথবা রুটির টুকরো কিংবা অন্য কোনো খাবার পড়ে যায়। তখন সম্ভব হলে, সেগুলো তুলে পরিচ্ছন্ন করে খেয়ে নেওয়া চাই।
হাদিসের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল (সা.)-এর খাবারকালে যদি কোনো খাবার পড়ে যেত— তাহলে তিনি তুলে খেতেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘খাবার খাওয়ার সময় যদি তোমাদের লুকমা পড়ে যায়, তাহলে ময়লা পরিষ্কার করে— তা খেয়ে নাও। শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯১৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪০৩)
হাত চেটে খাওয়া
খাবার শেষে স্বাভাবিকতই হাতে খাবার লেগে থাকে। তাই রাসুল (সা.) খাওয়ার সময় সর্বদা হাত চেটে খেতেন। না চাটা পর্যন্ত কখনো হাত মুছতেন না।
আঙুল চেটে খাওয়া
খাবারের সময় কিংবা খাওয়া শেষে আঙুল চেটে খাওয়া হয়। আঙ্গুল চেটে খাওয়ার ফলে বরকত লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকে। কারণ, খাবারের বরকত কোথায় রয়েছে— মানুষ তা জানে না।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করো তখন আঙুল চেটে খাও। কেননা বরকত কোথায় রয়েছে তা তোমরা জানো না। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৯১৪)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করবে, তখন হাত চাটা নাগাদ তোমরা হাতকে মুছবে (ধোয়া) না।’ (বুখারি, হাদিস : ৫২৪৫)
খাবার খাওয়া শেষে দোয়া পড়া
খাবার আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নেয়ামত। খাবারের মাধ্যমে তিনি আমাদের ওপর বড় দয়া ও অনুগ্রহ করেন। এ দয়ার কৃতজ্ঞতা আদায় করা হলো- সভ্যতা ও শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। তাই খাবার গ্রহণ শেষে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য।
রাসুল (সা.) খাবার শেষে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ দোয়া পড়তেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) খাবার শেষ করে বলতেন- ‘আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফিহি, গায়রা মাকফিইন, ওলা মুয়াদ্দায়িন ওলা মুসতাগনান আনহু রাব্বানা।’
এছাড়াও তিনি কখনো এই দোয়া পড়তেন- ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়াছাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৪৫৮)
আমাদের জীবনে রাসুল (সা.)-এর সুন্নতগুলো বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট হওয়া চাই। তাহলে আমাদের জীবন— সুন্দর ও সার্থক হবে। আল্লাহ তাওফিক দান করুন।
সুন্নতী কায়দায় মাটিতে বসে খাওয়ার আশ্চর্যজনক উপকারিতাগুলো
১. মাটিতে বসে খেলে একাগ্রতা বাড়ে। এমনকি পায়ের শক্তি বৃদ্ধি হয়।
২. মাটিতে বসলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়। ফলে শরীরে অতিরিক্ত এনার্জি পাওয়া যায়।
৩. মানসিক চাপ কমে, মনে ইতিবাচক চিন্তাভাবনার প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
৪. মাটিতে বসে খাবার খেলে মেদ, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাসের মতো পেট সংক্রান্ত সমস্যা এড়ানো যায়।
৫. মাটিতে বসে খাবার খেলে আলস্য দূর হয়। গোশতপেশিতে খিঁচ ধরা কমে।
৬. এতে মেরুদন্ডের নিচের অংশে জোর পড়ে। ফলে শরীরে আরাম অনুভূত হয়।
৭. মেঝে বা মাটিতে বসে খেলে খাবার তাড়াতাড়ি হজম হয়। এভাবে খেতে হলে মেঝে বা  মাটিতে প্লেট রেখে সামান্য ঝুঁকে খেতে হয়, তারপর আবার সোজা হয়ে বসতে হয়, এটাই স্বাভাবিক অভ্যাস। বারবার এই ঘটনা ঘটে বলেই অ্যাবডোমেনের মাসেলে টান পড়ে। এতে হজম হয় দ্রুত।
৮. মেঝে  বা মাটিতে বসে খেলে ওজন কমতে পারে দ্রুত। কারণ, এতে অ্যাবডোমেনের মাসেলের মুভমেন্ট হয় যা পেটের মেদ অনেকটা কমতে পারে। এতে মাথারও অনেকটা রিল্যাক্স হয়।
বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে চেয়ার-টেবিলে বসে খেলে ভেগাস নার্ভ (vagus nerve) ব্রেনে ঠিক মতো সিগনাল পাঠাতে পারে না। ফলে কখন যে পেট ভরেছে, তা বুঝতেই পারা যায় না। আর এমনটা হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই বেশি মাত্রায় খাওয়া হয়ে যায়। ফলে ওজন বাড়তে সময় লাগে না। কিন্তু মাটিতে বসে খেলে একেবারে উল্টো ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে পেট ভরা মাত্র এই বিশেষ নার্ভটি মস্তিষ্কে খবর পাঠিয়ে দেয়। ফলে সঙ্গে সঙ্গে খাবার ইচ্ছা চলে যায়। আর দিনের পর দিন নির্দিষ্ট পরিমাণ খাওয়ার কারণে খাওয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে, ওজনও আর বিপদ সীমা পেরতে পারে না।
৯. মেঝে বা মাটিতে বসে খেলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। এতে হার্টের অবস্থা ভাল থাকে। কারণ, মাটিতে বসলে হার্টের ওপর চাপ কম পড়ে। আর সারা শরীরে সমানভাবে রক্ত সঞ্চালিত হয়।
১০. নিয়মিত মাটিতে বসে খাওয়ার অভ্যাস করলে (health benefits of sitting on the floor) কোমর, পেলভিস এবং তলপেটের আশেপাশের অংশের ক্ষমতা তো বাড়েই, সেই সঙ্গে দেহের নিচের অংশের গুরুত্বপূর্ণ পেশীগুলির ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। ফলে সার্বিকভাবেই শরীর খুব নমনীয় বা ফ্ল্যাক্সিবল হয়ে ওঠে।
১১. মেঝে বা মাটিতে বসে খাওয়ার অভ্যাস করলে আপনার বসার স্বাভাবিক অভ্যাসটাই পাল্টে যেতে পারে। এর ফলে কোমর, পা থেকে মেরুদণ্ড, সব কিছুর উপকার হয়।
১২. মেঝে বা মাটিতে বসে খেলে মাথা ও শরীরের রিল্যাক্সেশন হয়। মেঝে বা মাটিতে বসে খেলেই শরীরে সহজে অক্সিজেন ফ্লো তৈরি হয়, যা শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।