আগামীর প্রজন্মকে রক্ষা করতে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের দিকে নজর দিতে হবে

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অভিশাপ নয় আশীর্বাদ হয়ে ওঠুক

আধুনিক জীবনব্যবস্থার সবচেয়ে বড়ো আশীর্বাদ হলো প্রযুক্তি। প্রযুক্তির কল্যাণেই মানুষের সঙ্গে মানুষের সকলরকম নিত্যনতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, চর্চা হচ্ছে শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের। চিকিৎসা, উৎপাদন, বিপণনসহ এমনকিছু নেই যার মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার যুক্ত হচ্ছে না। বর্তমান সময়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে সকলকিছুই প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তি ছাড়া এখন মানুষ একেবারেই অচল। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় যে- প্রযুক্তি যেমন আমাদের উপকারে আসছে, তেমনি এই প্রযুক্তি আমাদের জন্য বিপদও ডেকে আনছে। প্রযুক্তির আসক্তি যে কত ভয়াবহভাবে আমাদের সমাজে প্রভাব ফেলছে তা চোখ-কান একটু খুলে রাখলেই বুঝতে পারা যায়। প্রযুক্তির আসক্তি আসলে মাদকের নেশার আসক্তি থেকে কোনো অংশেই কম না। আধুনিক জীবনযাপনে সকলের উচিত যেখানে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার করা সেখানে এর নেতিবাচক ব্যবহারগুলো সবাইকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে। বলা যায়- প্রযুক্তি আমাদের ভালো করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারেই সর্বনাশ ডেকে আনছে।

প্রযুক্তি যেন আমাদের কল্যাণ করতে গিয়ে কোনোভাবেই অকল্যাণ করে না ফেলে সে দিকটায় অত্যন্ত সুদৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। পরিবারের অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের প্রযুক্তি আসক্তি থেকে দূরে রাখতে প্রথমে তাদের নিজেদেরকেই এই আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হবে। বলা হয়ে থাকে- ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা বাধ্যগত পাঠ্যসূচির শিক্ষার চেয়ে তারা তাদের পিতামাতা কিংবা অন্য অভিভাবকদের অনুকরণ করতে বেশি পছন্দ করে। দুর্ভাগ্যজনক যে ইদানীং কোনো কোনো পিতা-মাতা নিজেরাই এতবেশি প্রযুক্তিতে আসক্ত যে তাদের সন্তানদের তারা প্রযুক্তি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে পারে না। এ ব্যাপারে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। ট্রেনের কামরায় বসে একটি কিশোর গল্পের বই পড়ছে কিন্তু তার বয়সের অন্য আরও দুইটি ছেলেমেয়ে মোবাইলে গেমস খেলছে। এদের মধ্যে একজনের মা ঐ বইপড়ুয়া ছেলের মায়ের কাছে জানতে চাইলো আপনার ছেলে মোবাইলে গেমস না খেলে বই পড়ছে, এই অভ্যাস আপনি কীভাবে গড়ে তুললেন। তখন ঐ মা বললেন- ‘আসলে ছেলেমেয়েরা আমাদের আদেশ-নির্দেশ শোনার চেয়ে আমাদের অনুকরণ করতেই বেশি পছন্দ করে। আমরা বাবা-মা কখনোই মোবাইলে আসক্ত নই। আমরা অবসর পেলেই বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়ি; এটা দেখেই আমাদের সন্তানরা বইপড়ার অভ্যাস তৈরি করেছে।’ তখন প্রশ্নকারী মা ঠিকই অনুধাবন করতে সক্ষম হলো যে- তার ছেলেমেয়ের মোবাইল আসক্তির পিছনে তাদের দায়টাও নেহায়েত কম নয়।

আজকের দিনে বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার গেমসের দিকে বেশি সময় দেওয়ার ফলে নিজেদের পাঠ্যসূচির নিয়মিত পড়াগুলোও ঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- দিন যতই যাচ্ছে প্রযুক্তির এই নেতিবাচক দিক যেন ততই সবকিছুকে গ্রাস করে চলেছে। এ থেকে কীভাবে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব সেটা নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা ভাবছে বটে কিন্তু কার্যকর তেমন কিছুই করতে সক্ষম হচ্ছে না এখনো। আজকাল দেখা যায় ফ্রিফায়ারসহ বেশকিছু ক্ষতিকর গেমস-এর দিকে ছেলেমেয়েরা এতবেশি আসক্ত হয়ে পড়েছে যে, গ্রামেগঞ্জের হাটে-মাঠেও এখন একই দৃশ্য চোখে পড়ে। পথচলতে প্রায়শই দেখা যায় ছেলেরা মোবাইলের দিকে একদৃষ্টে চোখ গেঁথে বসে আছে এবং কোনোরকম ক্লান্তি ছাড়া গভীর মনোযোগে গেমস খেলে চলেছে। পাশাপাশি ওদের বন্ধুদের অনেকেই একসঙ্গে বসে আছে কিন্তু কেউ কারও দিকে সামান্যতমও খেয়াল দিচ্ছে না। তারা মোবাইলে এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছে যে- খাওয়ার সময়টুকু তারা পায় না, অনেকে সারা রাত জেগে এই গেমস খেলে। গণমাধ্যমের রিপোর্ট থেকে জানা গেছে যে- অনেক ছেলে ফ্রিফায়ার গেমস খেলতে গিয়ে বদ্ধপাগলও হয়ে গিয়েছে। আসক্তি এমনি একটি জিনিস যে, চাইলেও কেউ সহজে তা ছাড়তে পারে না। যেকোনো জিনিস বেশি বেশি ব্যবহার করার ফলেই ঐ জিনিসে মানুষ আসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকদ্রব্যে যেমন আসক্ত হলে বের হয়ে আসা কঠিন, এটাও অনেকটা তেমনই কঠিন। অনেকে রাতের অন্ধকারে বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে রাতের পর রাত মোবাইল ফোনে গেমস খেলার ফলে তাদের চোখের দৃষ্টিতে ভয়াবহরকম সমস্যা দেখা দেয়।

প্রযুক্তি আসক্তিতে পড়ে অনেক ছেলেমেয়ে মাদকাসক্তও হয়ে পড়ছে, এ নিয়ে শিশু-কিশোরসহ বড়োদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে এক ধরনের হতাশা। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও অপব্যবহার তরুণ প্রজন্মকে দিন দিন এমন বিপথগামিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে যে, যা রূপ নিচ্ছে নিদারুণ এক ভয়াবহতায়। শহরগুলোতে শিশুবান্ধব পরিবেশ, পর্যাপ্ত খেলার মাঠও তেমন একটা নেই, সেখানে ছেলেমেয়েরা একটু সময় কাটাবে, খেলবে। অস্বীকার করা যাবে না যে, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও একটু খোলামেলা জায়গার অভাবের কারণেও প্রযুক্তি ও মাদকাসক্ত বিষয়ক নেতিবাচক দিকগুলো আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশগুলোর তুলনায় এখন খুব বেশি পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ আজ ডিজিটাল পর্যায় থেকে চলে এসেছে স্মার্ট পর্যায়ে। আজ বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধবনিতা থেকে শুরু করে সব স্তরের জনগণ জানে এবং বুঝে অনলাইন মাধ্যমটি কী এবং কীভাবে তার ব্যবহার করতে হয়? অনলাইনের মাধ্যমে কী কী কাজ এবং কী কী সমস্যার সমাধান করা যায় তাও তারা জানে।

আমরা জানি, অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যম যেমন অনেক কাজকে সহজ ও সাশ্রয়ী করে তুলেছে তেমনি আবার রয়েছে এর অনেক মারাত্মক বিড়ম্বনাও। অনলাইন প্রযুক্তি কেড়ে নিয়েছে বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের স্বর্ণালি অতীত ও শৈশব। ছেলেমেয়েদের সেই শৈশবের দুরন্তপনা এখন আর নেই। তারা এখন ক্রমশ প্রযুক্তির দেওয়ালে বন্দি হয়ে পড়ছে। যে বয়সে ছেলেমেয়েদের বাধাহীন জীবনযাপন করার কথা, খেলার মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠার কথা; সে বয়সেই ছেলেমেয়েরা অন্ধকার ঘরবন্দি থেকে স্মার্টফোনসহ প্রযুক্তির বিভিন্ন ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা নেট নামক ডিজিটাল দুনিয়ায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে দিনরাত। তারা ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ নানা এ্যাপসভিত্তিক ওয়েবসাইটে পড়ে থাকছে দিনরাতের বেশিরভাগ সময়। যেখানে তারা ভালো সাইটের পাশাপাশি পর্নো সাইটেও সময় ব্যয় করছে। সন্দেহ নেই এটা তাদের অপরাধপ্রবণতার দিকে ধাবিত করছে। যার কুফলে তারা জড়িয়ে পড়ছে মোবাইলে বিভিন্ন ন্যুড দৃশ্যধারণ ও ধর্ষণের মতো মারাত্মক সামাজিক অপরাধে। এছাড়া মাদকসহ নানা সামাজিক অপকর্ম তো রয়েছেই। এটা কে না জানে যে- একটা অপরাধ আরেকটা অপরাধকে ডেকে নিয়ে আসে। কেননা, অপরাধবিজ্ঞানের মতে মানুষের মস্তিষ্কের গঠনটাই এমন যে- অপরাধ প্রবণতাগুলো একলা চলে না; তারা সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য প্রবণতাগুলোকেও আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসে। সমাজের এই ভয়াবহ নেতিবাচক দিক থেকে বের হয়ে আসার কোনো বিকল্প আছে কি?

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এখনো এ ব্যবস্থার যথাযথ উপযোগী হয়নি। শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পাঠদানের নামে অবলীলায় স্মার্ট ফোন হাতে তুলে দেওয়ার কারণে তাদের মধ্যে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা তৈরি হয়েছে বটে কিন্তু তার ভয়াবহতাও কম নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে শিক্ষা অর্জনের চেয়ে গেমসের দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে হয়তো শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই পড়াশোনা করতে পারছে, ব্যবসায়ীরা ব্যবসাবাণিজ্যে লাভজনক প্রক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারছে কিন্তু এর কুফল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সতর্ক থাকতে হবে সবসময়। এখন ই-কমার্সের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পণ্যের বাজার সৃষ্টি হয়েছে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গতিকে ত্বরান্বিত করছে। ঘরে বসেই জিনিসপত্র কেনাকাটা করা যাচ্ছে, মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে, ই-গভর্নেন্স চালুর মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে কাজের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হচ্ছে। সড়কপথ, রেলপথ, জলপথ এবং আকাশপথের যোগাযোগের ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে করেছে সহজতর, দ্রুত, নিরাপদ এবং আরামদায়ক। কিন্তু এতকিছুর পরও প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলোকে অস্বীকার করা যায় না কোনোভাবেই।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও অপব্যবহার তরুণ প্রজন্মকে দিন দিন বিপথগামিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে- যা রূপ নিচ্ছে নিদারুণ ভয়াবহতায়। প্রযুক্তির আরও একটি ভয়াবহ দিক হলো অনলাইনে জুয়াখেলা। চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই অনলাইনের জুয়াখেলায় নিজেদের যুক্ত করে ফেলে। একটা সময় অনেক টাকা খোয়ানোর পরে বুঝতে পারে তারা একটা প্রতারণার মধ্যে পড়ে গিয়েছে। তখন দেখা যায় মুহূর্তের মধ্যেই তারা ফকিরে পরিণত হয়েছে।

প্রযুক্তির আগ্রাসনে এবং উদাসীনভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে অনেক ব্যক্তির গোপনীয়তাও প্রকাশ হয়ে পড়ছে- যা ব্যক্তি হয়তো নিজেও জানে না। প্রযুক্তির ব্যবহার সহজীকরণ না থাকলে হয়তো ব্যক্তির এমন নৈতিক স্খলন হতো না। তাই এখন প্রত্যাশা একটাই- বাবা-মাসহ সব শ্রেণির অভিভাবককে সতর্ক হতে হবে- বিশেষ করে প্রযুক্তির এমন অপব্যবহার থেকে ছেলেমেয়েদের দূরে রাখতে হবে সবসময়। তার জন্য সম্ভাব্য যাকিছুই প্রয়োজন সেটা করতে হবে দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে। আগামীর প্রজন্মকে রক্ষা করতে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের দিকেই সকল সচেতন নাগরিককে মন ও মেধা বিনিয়োগ করতে হবে। 

আনিসুর রহমান খান: গীতিকবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক