নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জনে করণীয়-

স্বাভাবিক প্রবৃত্তির একটি হচ্ছে মানুষের নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা। মনের গভীরে আমরা সবাই কম-বেশি নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা লালন করে থাকি। সামনে থেকে অবদান রাখতে চাই পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজ কিংবা দেশের জন্য, সব খানে। হয়ে উঠতে চাই অনুকরণীয়, অনুসরণীয় নেতা। তবে এই অবদান রাখতে চাওয়া কিংবা একজন আদর্শ নেতৃত্ব হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য শুধু ‘ইচ্ছে’ থাকাই যথেষ্ট নয়। এজন্য নিজেকে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সচেতন চিন্তাধারা, নিয়মিত অনুশীলন এবং সাধনা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিজিনেস রিভিউতে এ প্রসঙ্গে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে নেতৃত্ব বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। পাঠক সমাদৃত ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, যদি নিজের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী গড়ে তুলতে চান তবে আপনাকে সবার আগে ‘আত্মসচেতন’ হতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, নিজেকে জানতে হবে, বুঝতে হবে। নির্ধারণ করতে হবে জীবনের লক্ষ্য। ভালো-মন্দ বুঝে নিয়ে লক্ষ্য অর্জনে তৎপর হতে হবে। কারণ, ব্যক্তিভেদে মানুষের জীবনের চাহিদা এবং পরিতৃপ্তির জায়গা ভিন্ন হয়। তাই অন্যের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজেকে খুঁজুন। নিজের ব্যক্তিসত্তার বিশেষত্ব বুঝে নিন। চিনে নিন নিজের বিশেষ শক্তির জায়গা।
মনে রাখবেন, আদর্শ নেতৃত্বের কোনো একক বা সর্বজনীন পথ নেই। বরং এ পথের আছে নানা রকম ফের। অতএব, অন্যকে অনুকরণ করতে গিয়ে স্বকীয়তা হারিয়ে ফেললে- তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে আপনার সহজাত নেতৃত্বের শক্তি এবং গুণাগুণ। এক্ষেত্রে একটা প্রচলিত প্রবাদের কথা মাথায় রাখা যায়। সেটি হলো: ‘জীবন একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় প্রতিটি পরীক্ষার্থীর প্রশ্নপত্র আলাদা। তাই একেকজনের উত্তরও হবে একেক রকম। অতএব, অন্যের খাতা দেখে নকল করলে আখেরে ক্ষতি আপনার-ই হবে। তাই আত্মসচেতন হয়ে খুঁজতে হবে নিজেকে বিকশিত করার উপায়। তবে এই যে আত্মসচেতনতা গড়ে তোলা, এটি কিন্তু একেবারে সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ে ভাবতে হবে। নিজের মধ্যেকার বিচ্যুতি শনাক্ত করে তা নিরসনে উদ্যোগী হতে হবে। আত্মসচেতনতা গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে নিজের ভুল বা সীমাবদ্ধতার কথা অস্বীকার করা এবং সমালোচনা গ্রহণ করতে না পারা। এতে আত্মোন্নয়নের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। তাই, গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করতে শিখুন- বিশেষ করে আপনার নেতিবাচক সমালোচনাগুলো যা আপনার কাছে অপছন্দনীয়।
সমালোচকের আয়নায় নিজেকে নিরপেক্ষভাবে দেখুন। ভাবুন। পজিটিভ চিন্তা করুন। নিজের জীবনের গল্প থেকে খুঁজে বের করুন- এই পৃথিবীতে আপনার কী ধরনের অবদান রাখার সম্ভাবনা, সুযোগ এবং প্রয়োজন আছে। নেতৃত্বের গুণাবলী গড়ে তোলার কোনো নির্দিষ্ট বা গড়পড়তা ‘সাজেশন’ যদিও নেই, তবে নিচের পরামর্শগুলো কাজে দিতে পারে:
–  সৎ মতে, সৎ পথে থাকুন।
–  সংক্ষেপে, স্পষ্টভাবে কথা বলুন। যতটা বলবেন, তার চেয়ে ঢের বেশি শোনার চেষ্টা করুন। ভালো শ্রোতা হতে পারা ফলদায়ী।
– মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করুন। বিশ্বস্ততা বজায় রাখুন। বিশ্বাস তৈরির ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা অত্যন্ত দরকারি।
–  উদ্দীপনা বাড়ান, ইতিবাচক থাকুন। মানসিক ইতিবাচকতা বাড়লে বাড়ে কর্মক্ষমতা।
–  পর্যবেক্ষণের অভ্যাস গড়ে তুলুন। চোখ-কান খোলা রেখে চারপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কাজ করলে তা আপনাকে আশাতীত ফলাফল এনে দিতে পারে।
– ধৈর্র্যশীল হন। জয়-পরাজয় জীবনের অংশ। অর্জনে মাত্রাতিরিক্ত গর্ব কিংবা হারানোতে মাত্রাতিরিক্ত হতাশা- দুটিই বাহুল্য।

দিনশেষে সবচে দরকারি হল নিজের দক্ষতাকে নিয়মিত শাণিত করতে থাকা। একজন ক্রীড়াবিদ বা ব্যায়ামবিদ নিজেকে যেমন নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যমে গড়ে নেয়, তেমনি নিজের দক্ষতাকে প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে নিতে সচেষ্ট থাকুন। নিজের প্রতি, মানুষের প্রতি যত্নবান হয়ে নিয়ন্ত্রণ নিন নিজ জীবনের নেতৃত্বের। হয়ে উঠুন একজন দায়িত্বশীল নেতা।