বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাবলিক বা সরকারি। কিন্তু তাদের নেই জমি, নেই ভবন। তারা যেন ‘ভূমিহীন, গৃহহীন’

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, তবু ‘ভূমিহীন, গৃহহীন’

১৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলছে কলেজের শ্রেণিকক্ষে, বিদ্যালয়ের ভবনে ও ভাড়া করা জায়গায়। নানা সমস্যা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাবলিক বা সরকারি। কিন্তু তাদের নেই জমি, নেই ভবন। তারা যেন ‘ভূমিহীন, গৃহহীন’।

যেমন সিরাজগঞ্জে অবস্থিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় আইন পাস হয়। ক্লাস শুরু হয় ২০১৮ সালের এপ্রিলে। এখন পাঁচটি বিভাগে পড়ছেন ১ হাজার ৪১ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টি চলছে তিনটি কলেজের শ্রেণিকক্ষে এবং দুটি ভবন ও একটি কনভেনশন সেন্টারের জায়গা ভাড়া নিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব ক্যাম্পাসহীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৮। যার মধ্যে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল এবং কৃষিশিক্ষার মতো বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। সরকার ২০১৩ সাল ও তারপর বিভিন্ন বছরে এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন করেছে। এরপর শিক্ষক নিয়োগ নেওয়া হয়েছে, শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে, কিন্তু সব কটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা হয়নি। তিনটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ চলছে। এর বাইরে কোনোটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে ১৪টির জমিও নেই, ভবনও নেই।

যেখানে-সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করার আগে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। না হয় ভালো মানের শিক্ষা সম্ভব নয়।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, সাবেক চেয়ারম্যান, ইউজিসি

ইউজিসির কাগুজে নির্দেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপেক্ষিত, মানছে না অনেকেই

একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসের জন্য যেসব প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে বিপুল টাকার ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। যেমন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২২৫ একর জমি অধিগ্রহণ ও নিজস্ব ক্যাম্পাস স্থাপনের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।

সরকার যেখানে আর্থিক চাপে রয়েছে, সেখানে বিপুল ব্যয়ের এসব প্রকল্প কবে অনুমোদন পাবে, কবে স্থায়ী ক্যাম্পাস হবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না।

শিক্ষার জন্য নিজস্ব উদ্যোগে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা করা, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষার্থীরা ‘যেনতেনভাবে’ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষা শেষ করছেন, কার্যত ঠকছেন।

যেমন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র শান্ত ইসলাম প্রথম আলোকে বলছিলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরনের শিক্ষার সুযোগ থাকা দরকার, তার কিছুই নেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পুথিগত পড়াশোনা হলেও ব্যবহারিক শিক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। শ্রেণিকক্ষের সংকট তো রয়েছেই। এভাবেই চার বছর পেরিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব ক্যাম্পাসহীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৮।

কলেজের শ্রেণিকক্ষে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। শুরুতে স্থানীয় শাহজাদপুর মহিলা কলেজের একটি ভবনের একাংশে অস্থায়ীভাবে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ছয় বছর পরও সেই কলেজেই বিশ্ববিদ্যালয়টির বাংলা, অর্থনীতি এবং সংগীত ও নৃত্যকলা নামের তিনটি বিভাগের কার্যক্রম চলছে।

শাহজাদপুর মহিলা কলেজে গত ২১ এপ্রিল গিয়ে দেখা যায়, কলেজটির চারতলা একটি ভবনের তিনটি তলা ব্যবহার করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। ওই ভবনের তিনতলায় ছোট্ট একটি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি চেয়ার-টেবিল রাখা। সেখানে বসেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাতজন শিক্ষক। দেখেই বোঝা যায়, কক্ষটিতে কোনোমতে বসা গেলেও এখানে বসে ক্লাসের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব নয়।

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে এখন ছয়টি বর্ষের (ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছেন। কিন্তু এই বিভাগের ক্লাসের জন্য শ্রেণিকক্ষ মাত্র একটি। তাই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেন শিক্ষকেরা। নেই কোনো সেমিনারকক্ষ।

শিক্ষার জন্য নিজস্ব উদ্যোগে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা করা, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শাহজাদপুর মহিলা কলেজ কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়কে কলেজের কক্ষ ছেড়ে দেওয়ার জন্য একাধিকবার চিঠি দিয়েছে বলে জানান কলেজটির অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে শাহজাদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় হোক, এটি তাঁরা চেয়েছিলেন। এ জন্যই কলেজটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেটা পাঁচ বছরের জন্য। এখন কলেজের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কলেজের স্থাপনা ছাড়ার জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তারা উত্তর দেয় না।

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার ব্যবহার করতে চান, তাহলে তাঁকে শাহজাদপুর মহিলা কলেজ থেকে যেতে হবে সরকারি বঙ্গবন্ধু মহিলা ডিগ্রি কলেজের নিচতলায় একটি কক্ষে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। মাঝের দূরত্বের রিকশাভাড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি ছোট, আকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরির সমান।

আবার রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে অনেকটা দূরে। রিকশাভাড়া কমপক্ষে ২০ টাকা। সেখানে গিয়ে জানা গেল দুটি ভবনে ভাড়া করে চলছে প্রশাসনিক কাজ। সেখান থেকে অনেকটা দূরে ‘সীমান্ত কনভেনশন সেন্টার’ ভাড়া নিয়ে সম্প্রতি সমাজবিজ্ঞান বিভাগ এবং মিলনায়তনের কার্যক্রম চালু করেছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। আর পার্শ্ববর্তী মওলানা ছাইফউদ্দিন এহিয়া ডিগ্রি কলেজের একাংশে চলে ব্যবস্থাপনা বিভাগের ক্লাস।

ইউজিসি জানিয়েছে, দেশে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫৫টি। অনুমোদন (আইন) হয়েছে আরও ছয়টির।

ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এভাবে ছয় বছর ধরে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। ইউজিসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাবে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগে শ্রেণি কার্যক্রমের জন্য দিনে যত কর্মঘণ্টা দরকার, কার্যত সেটি ঠিকমতো সম্ভব হয় না।

এদিকে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসিক হল না থাকায় দূরদূরান্ত থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের খরচ বেড়ে যায়। অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে তাঁর মাসে ১০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। আবাসিক হল থাকলে খরচ কম হতো।

সরকার অবশ্য শিক্ষার্থীদের পেছনে কম ব্যয় করছে না। ২০২২ সালের তথ্য নিয়ে করা ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপিছু ব্যয় বছরে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার টাকা। এই হিসাব অবকাঠামো উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয় বাদে। টাকাগুলো যায় মূলত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যয়ে।

চাহিদা অনুযায়ী নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হতেই পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ থাকাটা জরুরি।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর, ইউজিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শাহ আজম নিজ কার্যালয়ে ২১ এপ্রিল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংকট মেটাতে তিনি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নিজস্ব ক্যাম্পাসের জন্য স্থান নির্ধারণ করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব ইউজিসির মাধ্যমে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সরকারও বিষয়টি নিয়ে আন্তরিক।

শাহজাদপুর শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে স্থানীয় তিনটি নদীর মোহনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২২৫ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। গিয়ে দেখা যায়, জায়গাটি নিচু। ভূমি অধিগ্রহণ ও ভরাটে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে। সেই টাকা কবে বরাদ্দ পাওয়া যাবে, কবে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হবে, কবে ভরাট করা শুরু হবে—এসব প্রশ্নে কেউ আশাবাদের কথা শোনাতে পারেননি।

স্কুলের ভবনে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয় ২০১৫ সালের জুলাইয়ে। প্রথম উপাচার্য হিসেবে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়োগ দেওয়া হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শহীদুর রহমান খানকে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা নয়, শুরুতেই আলোচনায় আসে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে। প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক শহীদুর রহমান খান নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে স্বজনদের নিয়োগ দিয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন। তাঁর মেয়াদ শেষ হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এখন সাতটি অনুষদের আওতায় ৫১টি বিভাগে ৬৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। আর শিক্ষক রয়েছেন ১০৪ জন। নিয়োগ করা হয়েছে ৭০ জন কর্মকর্তা ও ২৫২ জন কর্মচারী।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ভাড়া করা ভবনে চলছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় (প্রথম ধাপ) অবস্থিত একটি আবাসিক ভবনে। আর একাডেমিক কার্যক্রম চলে প্রশাসনিক ভবন থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে দৌলতপুরের দিয়ানা এলাকায় দৌলতপুর বেসরকারি কলেজিয়েট স্কুলের তিনতলা ভবনে। স্কুলের ভবনটি পুরোটাই ব্যবহার করে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ, স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়নি। গত বছর পাশের আরেকটি দোতলা ভবন ভাড়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিজস্ব ক্যাম্পাস ও অবকাঠামো নির্মাণের যে প্রকল্প প্রস্তাব (খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, প্রথম পর্যায়, ২০২৮ সাল পর্যন্ত) করা হয়েছে, তার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের ২৫০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি ইউজিসি থেকে অনুমোদিত হয়ে এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম যে ভালোভাবে চলছে না, তা স্বীকার করে তিনি বলেন, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও ব্যবহারিক ক্লাস নিতে হয়, তা পুরোপুরি সম্ভব হয় না। ব্যবহারিকের জন্য কোর্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া হয়। পূর্ণাঙ্গ না হলেও যতটুকু না হলেই নয়, ততটুকু ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

জমি আছে, ভবন নেই ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের

গাজীপুরের বিশেষায়িত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির আইন হয় ২০১৬ সালে। তার দুই বছর পর ২০১৮ সালের জুনে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ৪৫৯ জন। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো বিশ্ববিদ্যালয়টি পায়নি নিজস্ব ভবন ও ক্যাম্পাস। কার্যক্রম চলছে দুটি ভাড়া করা ভবনে। শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বাসা ভাড়া নিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে শ্রেণিকক্ষের সংকট। ছোট ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে নেওয়া হয় ব্যবহারিক ক্লাস। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দেশের অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে তাঁদের ক্লাসের ব্যবস্থা আধুনিক। কিন্তু আফসোস, একটি আধুনিক ক্যাম্পাস নেই। তবে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে কথা চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার লতিফপুর এলাকায় বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কসংলগ্ন ৫০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির জন্য। তবে দীর্ঘদিনেও সেখানে কোনো স্থাপনা হয়নি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, তার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়টির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। আর কিছুদিন পরই পাস করে চলে যেতে হবে। কিন্তু দুঃখ থেকে যাবে, একটি ভালো ক্যাম্পাস পেলাম না।’

অবকাঠামো না করেই শিক্ষার্থী ভর্তি

ইউজিসি জানিয়েছে, দেশে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫৫টি। অনুমোদন (আইন) হয়েছে আরও ছয়টির। এর মধ্যে ২০১৩ সাল ও তার পর থেকে ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়। এর মধ্যে অধিকাংশই হলো কৃষি, মেডিকেল, ডিজিটাল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। যেগুলোর মধ্যে ১৮টি চলছে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে। এ ছাড়া দেশে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১১৪টি।

ইউজিসি এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাওয়ার পর ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দেওয়া হয়। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের নামে বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা ও মানসম্পন্ন পাঠদান অগ্রাধিকারে থাকে না। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনোটিতে ভূমি অধিগ্রহণেও অনিয়মের অভিযোগ উঠছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতিষ্ঠার সাত বছরের মধ্যে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হয়। আবার নিজস্ব ক্যাম্পাসের আগে বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর জন্য ন্যূনতম ২৫ হাজার বর্গফুটের ভাড়া বা নিজস্ব জায়গা থাকতে হয়। ইউজিসি স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বারবার তাগাদা দেয়। নিজস্ব ক্যাম্পাসে না যেতে পারলে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে। এ কারণে পুরোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থায়ী ক্যাম্পাসে চলে গেছে। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এ রকম কোনো নিয়ম নেই।

আইন পাসের পরই বিভিন্ন বিভাগে যেনতেনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দেওয়া হয়। তারপর আবার নতুন নতুন বিভাগ চালুর তোড়জোড় শুরু হয়। যেমন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে পাঁচটি বিভাগ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আরও কয়েকটি বিভাগ অনুমোদনের জন্য ইউজিসির কাছে আবেদন করেছে। যদিও এখনো তার অনুমোদন দেয়নি ইউজিসি।

নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন হওয়ার পরপরই ভাড়া করা বাড়ি বা যেখানে-সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর সুযোগ বন্ধ করতে ইউজিসি একটি নীতিমালা করেছে। বছরখানেক আগে এটি ইউজিসির সভায় অনুমোদন দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে তা এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। মন্ত্রণালয় সেটি কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে আবার ইউজিসিতে পাঠিয়েছে।

ইউজিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হতেই পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ থাকাটা জরুরি। এ জন্যই ইউজিসি চায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর আগেই অবকাঠামোগত ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা ও যোগ্য জনবল নিশ্চিত করা হোক।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর আরও বলেন, নিজস্ব ক্যাম্পাসে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা ও যোগ্য শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করলে তো ক্ষতি নেই।

‘আগেই প্রস্তুতি দরকার’

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোর পাশাপাশি একটি সাধারণ সমস্যা হলো সেগুলোতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব প্রকট। শিক্ষকেরা বেশির ভাগই নতুন নিয়োগ পাওয়া।

সার্বিক বিষয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম  বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হতেই পারে। কিন্তু ব্যাপক যাচাই-বাছাই এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে তা করতে হবে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই হবে না, ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগসহ অন্যান্য একাডেমিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, যেখানে-সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করার আগে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। না হয় ভালো মানের শিক্ষা সম্ভব নয়।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন শেখ আল এহসান, খুলনামাসুদ রানা, গাজীপুর]

সূত্র: প্রথম আলো