জনগণকে যেভাবে ভুলিয়ে রাখেন বিশ্বনেতারা

জনগণের সামনে বারবার ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও কিছু কিছু রাজনীতিবিদকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে থাকে সাধারণ জনগণ। নিজেদের অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অন্যকে গ্রহণ করতে বাধ্য করান তারা। এক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করেন জনগণকে ভুলিয়ে রাখার কিছু মন্ত্র।

জনপ্রিয় রাজনীতিবিদরা শুধু মুখের মিষ্টি কথাতেই কোনো জাতির বিভক্তিকরণ, সংস্কৃতিতে দ্বন্দ্ব তৈরি অথবা অন্যের প্রতি ঘৃণা জাগিয়ে তুলতে পারেন। প্রতিপক্ষের প্রতি ধীরে ধীরে ঘৃণা সৃষ্টি করা অথবা তা প্রচারের কাজে ইতিহাসের বিভিন্ন স্বৈরশাসক এক ধরনের ‘অমানবিক রূপক’ ব্যবহার করে থাকেন।

‘পলিটিকস, লাইস অ্যান্ড কন্সপাইরেসি থিওরিস : অ্যা কগনিটিভ লিঙ্গুয়েস্টিক পারসপেকটিভ’ নামক এক গবেষণায় টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিওটিকস ও ভাষাগত নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মার্সেল ডেনেসি কর্তৃক এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান অথবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ অতীত ও বর্তমান কিছু রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে।

বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ‘স্থানীয় ভাষাতত্ত্ব’ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ভাষাবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যেখানে ভাষা ও  মনের পারস্পারিক সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়।

সাধারণ চোখে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তাভাবনা দুটি ভিন্ন সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত বিষয়।

গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রাচীনকাল থেকেই প্রভাবশালী নেতারা কিছু শব্দ ব্যবহার আর বক্তৃতার মাধ্যমে মানুষকে অতি আবেগপ্রবণ করে তুলেন। তখন তারা কংগ্রেসের আসনে মার্চ করা অথবা প্রতিবেশী কোনো দেশকে আক্রমণ করার মতো সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হয় না। ভাষা ব্যবহার করে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ছড়িয়ে দিতে পারে। সমাজকে করে তুলতে পারে অস্থিতিশীল। তৈরি করতে পারে জাতিতে জাতিতে বিভাজন।

স্বৈরশাসকদের অমানবিক রূপকের উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে নাৎসি শাসনকালের কথা। সেসময় বহিরাগত ও সংখ্যালঘুদের বোঝাতে ‘সরীসৃপ’ ও ‘পরজীবী’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হতো।

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লক্ষ্যবস্তু করা কোনো সামাজিক গোষ্ঠীকে বোঝাতে শক্তিশালী নেতারা তাদের ‘ইঁদুর’, ‘কীটপতঙ্গ’ অথবা ‘প্লেগ’ শব্দগুলোর মতো রূপক ব্যবহার করতেন। আর এসব রূপক শোনার পর সাধারণ মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে পরিবর্তিত হয়, যা তাদের মধ্যে আরও বড় মিথ্যা আর ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বিশ্বাসের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে।

মানুষকে প্রভাবিত করার কাজে রূপকগুলো যেভাবে কাজ করে: জনসাধারণকে প্রভাবিত করার প্রথম ধাপ বা পূর্বশর্ত হলো শ্রোতাদের একটি সঠিক সংবেদনশীল অবস্থা চিহ্নিতকরণ। মানুষ তার মনের মধ্যে ভয় বা অনিশ্চয়তা অনুভব করতে হবে। মানুষের মনের সংবেদনশীল অবস্থায় অমানবিক রূপকগুলো বেশি কার্যকর হয়।

এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ চিত্র ও ধারণাগুলোকে একত্রিত করে ভাষা মানুষের মস্তিষ্কে বিদ্যমান সার্কিটগুলোতে ট্যাপ করে ও ‘সুইচ অন’ করে। রূপকগুলো উচ্চতর জ্ঞানীয় যুক্তির সঙ্গে এমন সংযোগ তৈরি করে যার বাস্তবে কোনো ভিত্তি না-ও থাকতে পারে। আর যখন এটি ঘটে তখন কোনো ব্যক্তির মধ্যে রূপকগুলো যে মিথ্যা তা বোঝার সক্ষমতা আর থাকে না। এগুলোকে সঠিক বলে মনে করতে থাকে। আর এ ধরনের রূপকের ব্যবহার যত বেশি ব্যবহার করা হয় তা  তত বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে থাকে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বে একই ধরণ অনুসরণ করা হয়। এই গবেষণায় উঠে এসেছে চিন্তাভাবনার কোনো ধরন একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তা কোনো মানুষের ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনা করা কঠিন। অর্থাৎ কেউ যদি ইতোমধ্যেই অমানবিক রূপকের আকারে ছড়ানো মিথ্যা বিশ্বাস করে আর কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মুখোমুখি হয় তাহলে তাদের মধ্যে প্রভাবিত হওয়ার মাত্রাও বাড়তে থাকে।

একবার মানুষ কোনো মিথ্যাকে বিশ্বাস করতে শুরু করলে বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক যত প্রমাণই তাদের সামনে হাজির করা হোক না কেন তারা তাদের মন পরিবর্তন করতে পারে না।

বিদেশিদের প্রতি ঘৃণা তৈরিতে অমানবিক রূপকের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে ২০১০-এর দশকে পপুলিস্ট ও অতি-ডানপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থানের সময়।

২০১৬ সালে হাঙ্গেরিতে উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত প্রচারণা চালানোর সময় দেশটির নেতা অরবান তাদের একটি ‘বিষ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেনের নেতাদের ‘নাৎসি’ হিসাবে বর্ণনা দেওয়াও এক ধরনের অমানবিক রূপকের ব্যবহার।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একটি বড় মিথ্যা ব্যবহার করে ষড়যন্ত্র তত্বের ধরন অনুসরণ করেছিলেন। ডানপন্থি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়লে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটলে আক্রমণ করতে তার সমর্থকদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তিনি।

সূত্র: যুগান্তর