বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু যে কারণে কমেছে

Views: 2

ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ: বাংলাদেশে স্বাধীনতার সময় গড় আয়ু ছিল ৩৭ বছর। এরপর থেকেই পর্যায়ক্রমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার ইতিবাচক অগ্রগতি, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি, কার্যকরী টিকা কর্মসূচি, নিরাপদ পানি ও খাদ্য সরবরাহ ইত্যাদির ফলে নারী-পুরুষের গড় আয়ু বাড়তে শুরু করে।

মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিকে উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে মনে করা হয়। বিগত বছরগুলোতে বিবিএসের এ সংক্রান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই গড় আয়ু বাড়ছিল। তথ্যানুসারে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ু ছিল ৬৭ বছর ২ মাস। ২০১৭ সালে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৭২ বছর। এর পরের বছর তা বেড়ে হয় ৭২ বছর ৩ মাস। ২০১৯ সালে গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ বছর ৬ মাস। ২০২০ সালের জরিপে প্রত্যাশিত গড় আয়ু আরও বেড়ে হয় ৭২ বছর ৮ মাস। কয়েক বছর বৃদ্ধির প্রবণতা থাকলেও এবারই ২০২২ সাল থেকে  প্রথমবারের মতো গড় আয়ু কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

গত কয়েক বছর গড় আয়ু বাড়ার তথ্য দিয়ে আসছে বিবিএস। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু কিছুটা কমেছে এবং বর্তমানে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু দাঁড়িয়েছে ৭২ বছর  ৩ মাস। নারী ও পুরুষ উভয়ের গড় আয়ু কমেছে। পুরুষের গড় আয়ু ৭১ বছর ২ মাস থেকে কমে বর্তমানে ৭০ বছর  ৬ মাসে নেমে এসেছে। আর নারীর গড় আয়ু ৭৪ বছর ১ মাস, যা আগের বছর ছিল ৭৪ বছর ৫ মাস, কমেছে ৪ মাস। দেখা যাচ্ছে পুরুষের তুলনায় নারীদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেশি।

অন্যদিকে বর্তমানে মৃত্যুর হারও অন্য বছরগুলোর চেয়ে বেশি। ২০১৯ সালে ছিল ৪ দশমিক ৯ জন। ২০২০ সালে ছিল ৫ দশমিক ১ জন। ২০২১ সালে মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৫ দশমিক ৭ জন। অর্থাৎ মৃত্যুহার বেড়েছে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী করোনা মহামারির কারণে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু কমে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনো অন্য কোনো কারণে প্রত্যাশিত আয়ু এক ধাক্কায় এতটা কমেনি। বিবিএস জানিয়েছে, মূলত করোনা মহামারির কারণে মৃত্যু হার বৃদ্ধি পাওয়ায় গড় আয়ু কমেছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটিই একমাত্র কারণ নয়। কভিড-পরবর্তী নানা জটিলতায় অনেক মানুষ মারা গেছেন। এ ছাড়াও আরও কিছু কিছু রোগ বা অন্যান্য কারণও মৃত্যুর জন্য দায়ী।

করোনাকালে মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগেন যেমন কিডনি, লিভার, হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোক, তারা সময় মতো যথাযথ চিকিৎসা পাননি, এমনকি করোনার ভয়ে ঘরে বসেই অনেকটা বন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া বা ফলোআপ করাতে পারেননি। এমনকি ওই সময়টাতে করোনা রোগীর চাপ বেশি থাকায় অনেক হাসপাতালকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়। ফলে অন্য রোগীরা বা যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগতেন, তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। ফলে চিকিৎসার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। এমনকি ঘরে থেকে অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন।

তবে সার্বিক দিক বিবেচনা করলে আরও কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের অনেক মানুষ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা অনেকটা সীমিত এবং সত্যিকারের স্বাস্থ্যসেবা সঠিকভাবে পায় না। দ্বিতীয়ত, নিম্নআয়ের, গরিব জনগোষ্ঠী, নিম্নমধ্যবিত্ত এমনকি অনেক উচ্চমধ্যবিত্তসহ জনগণের বিশাল অংশ জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হলে অর্থনৈতিক কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দেখা যায়, অনেক জটিল রোগে নিজের সহায় সম্বলটুকু বিক্রি করে অথবা টাকা-পয়সা ধার করে চিকিৎসা করাতে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। অনেক ক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না, রোগী মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বায়ুদূষণের কারণে অনেক মানুষ শ্বাসজনিত রোগে মারা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ফুসফুস এবং হার্টের রোগের কারণেও অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। আবার রোগ হলে সঠিক সেবাটা পায় না। ফলে মানুষ মারা যাচ্ছে বেশি, যা গড় আয়ুতে প্রভাব ফেলেছে।

জীবন ধারণ কিছুটা কষ্টকর হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক কারণে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। খাদ্য ও পুষ্টির ঘাটতির কারণে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। যথা সময়ে মানুষ চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। একই সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমেছে। শারীরিক এবং মানসিকভাবে অনেকেই ভালো অবস্থায় নেই। আবার অর্থাভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রাপ্তিও অনেকের ভাগ্যে জোটেনি। সুতরাং অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং মানুষের খাদ্য, পুষ্টি ও চিকিৎসা যথাযথভাবে হচ্ছে না বলেই আয়ু কমে যাচ্ছে।

দেশ থেকে যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও পোলিওর মতো সংক্রামক রোগ নির্মূলের পথে রয়েছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসার উন্নতি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেশে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে অসংক্রামক ব্যাধি, যা নীরব ঘাতকের মতো ধেয়ে আসছে এবং আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বার্ধক্যজনিত রোগ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, অস্টিওপরোসিস, অস্টিওআর্থাইসিস, উচ্চরক্তচাপ, ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের প্রদাহ এবং মানসিক রোগ, এ ধরনের রোগের প্রকোপ মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, হয়ে উঠছে বড় ঘাতক এবং মৃত্যুর হার বাড়াচ্ছে।

এ কথা স্বীকৃত সত্য যে শিশু ও মাতৃমৃত্যু রোধে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্ব স্বীকৃত। তবে ২০২১ সালে মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার বেড়েছে। প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্ম শিশুর বিপরীতে মাতৃমৃত্যু বেড়েছে ১৬৮ জন। এর আগের বছর ছিল ১৬৩ জন। জন্মদানকালে গ্রামে বেশি মৃত্যু হয়। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি হাজারে মারা গেছে ২২ জন। আগের বছর এ হারছিল ২১ জন। মেয়ে শিশুর চেয়ে ছেলে শিশুর মৃত্যুহার বেশি। অন্যদিকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার টানা তিন বছর অপরিবর্তিত আছে। দেশে মাতৃমৃত্যুর হার ১৬৫। অর্থাৎ এক লাখ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে বর্তমানে ১৬৫ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। গ্রামে মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখে ১৭৬ জন এবং  শহরে ১৪০ জন।

মনে রাখতে হবে, সুস্থ বা নীরোগ অবস্থায় বেঁচে থাকা এবং অসংক্রামক দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ে বা এর জটিলতা নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই যে গড় আয়ু তা আসলে রোগে শোকে, দীর্ঘমেয়াদি রোগের ভোগান্তিসহ সব বয়সের সমন্বয়ের ফলাফল। বাংলাদেশে মানুষ আসলে সুস্থ থেকে বাঁচে ৬৪ বছর ৩ মাস। আগের হিসাব অনুযায়ী আজ একটি শিশু জন্ম নিলে ছেলে হলে আশা করা যায় ৭১ বছর ২ মাস এবং কন্যাশিশু হলে ৭৪ বছর ৫ মাস বাঁচবে। এটাই তাঁর প্রত্যাশিত আয়ু বা গড় আয়ু। আসলে কিন্তু এই পুরো সময় সে সুস্থভাবে বেঁচে থাকে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর ৩ মাস। তবে মানুষের স্বাস্থ্যকর আয়ু ৬৪ বছর ৩ মাস। এ ক্ষেত্রে পুরুষের স্বাস্থ্যকর গড় আয়ু ৬৪ বছর ২ মাস, নারীর স্বাস্থ্যকর গড় আয়ু ৬৪ বছর ৪ মাস। অসুস্থতার কারণে অজান্তে জীবন থেকে প্রায় ১০ বছর হারিয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান ২০২২-এর প্রতিবেদনে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আয়ু বিষয়ে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।

এ কথা সত্য যে, সারা বিশ্বের মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। অর্থাৎ আগের চেয়ে এখন মানুষ বেশি দিন বেঁচে থাকছে। তবে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বেঁচে থাকাই বড় কথা নয়। সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি।  তাই প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যকর আয়ু স্বাস্থ্যের সূচক হিসেবে ধরা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দিতে হবে স্বাস্থ্যকর আয়ুর ওপর। উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিন্ত করে এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন এনে এটা সম্ভব।

লেখক : প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক

Zeen is a next generation WordPress theme. It’s powerful, beautifully designed and comes with everything you need to engage your visitors and increase conversions.

More Stories
বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা : সমস্যা নির্ণয় করা জরুরি