একজন নতুন ব্যবসায়ীর ৫টি ভুল ও শুধরানোর উপায়

উদ্যোক্তা

আবু মো: আব্দুল্লাহ : অনেকেরই স্বপ্ন থাকে, কর্মজীবন শুরু করবে ব্যবসায়ী হয়ে। এই খেয়ালের পেছনে সবসময় যে অনেক টাকা উপার্জনই একমাত্র অনুপ্রেরণা, তা নয় কিন্তু।

অনেকে থাকে এই পেশাকে ভালোবেসেই আসে, কারণ ব্যবসার মাধ্যমে যখন কিছু মানুষের প্রয়োজন মিটানো যায়, সমাজে একটা অবস্থান তৈরী করা যায় সাথে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয় নিজের কারণে, ব্যবসায়র গুরুত্ব যাপিত জীবনে বেড়েই যায় শুধু তখন।

কিন্তু, ব্যবসায় করতে গেলে যে একটা উদ্দীপনা থাকে থাকে প্রথমে, সেটা হারিয়ে যায় ও ভালোলাগা বদলে হয়ে যায় হতাশা। কেন? কিছু ভুলের কারণে! আজ আমরা দেখবো ঠিক এমনি কয়েকটি ভুল যা শুরুর দিকে হয়ে থাকে আর যেগুলো খেয়াল করা ভীষণ জরুরি একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য। পাঠকের সুবিধার জন্য ভুলগুলোর সাথে শুধরানোর উপায় ও আলোচনা করা হলো।

নতুন ব্যবসায়ীদের ৫টি ভুল ও শুধরানোর উপায়

১. হুজুগে শুরু করা
সবচেয়ে বড় ভুল হলো আগে পিছে না ভেবে হুজুগে ব্যবসায় শুরু করা! সাধারণত এটা হয় যখন চারপাশে পরিচিত মানুষজন কোনো ব্যবসা (অনলাইন বা অফলাইন) শুরু করে লাভবান হয়। এই অন্যের সফল হওয়ার ব্যাপারটি অনেককে ভীষণ উৎসাহ দেয়। এই উৎসাহ পর্যন্ত ঠিক থাকে কিন্তু যখনি শুধু অন্যের সফলতা দেখে নিজে একদম কোনো কিছু গভীরভাবে না ভেবে শুরু করা হয়, ব্যবসায় সফল হওয়ার স্বপ্ন তখন ভেঙে যায়। আসলে কেউ যখন সফল হয় তার পেছনে থাকে অনেক পরিশ্রম, সাধনা ও লেগে থাকার মানসিকতা। সফলতা হুট্ করেই একদিনে আসেনা। বাইরের মানুষজন শুধু মুনাফা বা প্রফিট দেখে আর তাই ভাবে ও যদি সফল হতে পারে, আমিও পারবো! আর শুধু এই ভেবে কাজ করতে আসাটাই হয়ে যায় ভুল।

২. গবেষণা না করা
ব্যবসায় শুরুর ক্ষেত্রে গবেষণার বিকল্প নাই। কিন্তু নতুন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী অনেকেই এই গবেষণা করার ব্যাপারটিকে খুবই হালকা ভাবে গ্রহণ করে থাকে। তারা ভাবে “আমি যেটা জানি, সেটাই ঠিক!” এই ধারণাটা কখনো আত্মঘাতী হয়ে যায়। পরিকল্পিত ভাবে যদি –

•    পণ্যের উৎস
•    ক্রেতার চাহিদা
•    ক্রেতার ক্রয়-ক্ষমতা
•    ব্যবসায়ের আকর্ষণীয় দিক
•    মূলধনের পরিমান

এসব বিষয় নিয়ে যথেষ্ট তথ্য জোগাড় ও পর্যালোচনা করে ব্যবসায় শুরু না করলে সেক্ষেত্রে কিছুদিনের মধ্যেই সমস্যা দেখা দেয়। আর যখন প্রফিট না হয়, ব্যবসায়ীর মনোবল শেষ হয়ে যায়।

৩. দ্রুত লাভের আশা করা
কিছু ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের দেখা যায় ব্যবসা স্থাপনার পর থেকেই দ্রুত লাভের আশা করে। আর  যখন সেটা বাস্তবে না হয়, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে পার্থক্য দীর্ঘ হয়, তারা ভেঙে পরে। ব্যবসা তাদের জন্য না, এখানে কোনো সুযোগ নেই, সততার দাম নেই – এরকম অনেক কথা শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু যে ভুলটা হয়ে যায় তাদের তা হলো “আজ ব্যবসা দাঁড় করলে আগামীকালই প্রফিট আসবে না” এই কথায় বিশ্বাস না করা।  একটা ব্যবসায় যখন শুরু হয়, প্রতিদিন সেটা নানামুখী পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যায়। খরচের পরিমান বাড়তে থাকে ও চ্যালেঞ্জ আসতে থাকে। এসব কিছু ঠান্ডা মাথায় ধৈর্য ধরে মোকাবেলা করতে পারলেই সফলতা আসে। কিন্তু ওই ধৈর্যটুকু না থাকলে সফল হওয়া যায়না।

৪. সাপোর্ট গ্রুপ তৈরী না করা
মাঝে মাঝে আমরা ভাবি, আমি ভালো পণ্য তৈরী করছি আমার প্রচার প্রসারের জন্য আলাদা করে কোনো গ্রুপ তৈরী করার প্রয়োজন নেই। যে একবার কিনবে সেই আসবে আরেকবার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন! বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিশালী প্রভাবে সাপোর্ট গ্রুপ তৈরী করা খুব প্রয়োজন।  এই গ্রুপ হচ্ছে খুব কাছের পরিচিত ও শুভাকাঙ্খীদের নিয়ে একটি সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ তৈরী করা যেখানে ওই মানুষগুলো তাদের মতামত ও পরামর্শ জানাবে ও পণ্য সম্পর্কে অন্যদের উৎসাহ দিবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে আমাদের সবারই রয়েছে হাতে গোনা নির্ভর করার মতো কিছু মানুষ যারা আমার ব্যবসায়ী হওয়া বা স্বাধীন হওয়ার প্রচেষ্টাকে সম্মান করবে। তাদেরকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ের শুরু দিকে কিছু প্রচার ও প্রসার না করলে অনেক ব্যবসায়ে সফল হওয়া কঠিন হয়ে যায়। হতাশা চলে আসে।

৫. ট্রেন্ড ধরতে না পারা
এটা একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যবসায়ে সফল হওয়ার জন্য। প্রতিটা সময়েই ক্রেতা, বিক্রেতা, দেশি ও বিদেশী ব্যবসায় জগতে কিছু না কিছুর একটা আলোড়ন থাকে। কখনো মানুষের জীবনধারায় প্রযুক্তি প্রাধান্য পায়, কখনো সৌন্দর্যবর্ধনের পণ্য নিয়ে মানুষ ব্যস্ত থাকে বেশি আবার কখনো শরীর ও মনের সুস্থতার চিন্তা ও উপযোগী পণ্য বা সেবা নিয়ে মানুষ আগ্রহ প্রকাশ করে বেশি। কখনো অনলাইন কেনাকাটা ও কখনো কিছু ক্ষেত্রে অফলাইন কেনাকাটা মানুষ পছন্দ করে।  যদি কোনো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাই ট্রেন্ড বা চলতি ধারার প্রতি মনোযোগী না হয়ে ব্যবসায়ে এসে যায় তখন ঝুঁকি বেড়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় – স্বাস্থ্য সচেতন মানুষজনের জন্য মিষ্টি জাতীয় খাবারের ক্ষেত্রে সাদা চিনির পরিবর্তে বাদামি বা লাল চিনির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া।এই পরিবর্তনটা যদি কেউ বুঝতে না পারে তাহলে সেরকম খাবার প্রস্তুত ও করা হচ্ছেনা প্রফিট ও আসছে না। তাই যখন ব্যবসায় শুরুর ক্ষেত্রে সেই ব্যবসায়ের পণ্য বা সেবায় নতুন কি ট্রেন্ড আসছে এটা জানা খুবই জরুরি।

ব্যবসায় নিঃসন্দেহে একটি আকর্ষণীয় পেশা ও উন্নয়নমূলক কাজ।কিন্তু কিছু ভুল ও অসাবধানতার কারণে একজন তরুণ ব্যবসায়ীর আর সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা হয়না। সফল ব্যবসায়ী হতে গেলে এই আলোচনাগুলো একজন নতুন ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাকে সাহায্য করবে, এই আশা রাখছি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *