মিথ্যা কথা বলতে আমার মা নিষেধ করেছেন।

জাতীয় মতামত

এম এস হাবিবুর রহমানঃ পৃথিবীতে তোমার হাজার হাজার বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী থাকবে, কিন্তু সবশেষে তুমি একজন মানুষকেই খুজে পাবে, যাকে তুমি শত আঘাত দেওয়ার পরেও সে শুধু তোমার ভবিষ্যত নিয়েই ভাবে, মায়ের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও যথাযথ সম্মান প্রদর্শন ও মায়ের সন্তানের বাবা, পরিবার পরিজন এবং বড় হয়ে খোঁজ খবর নিতে ভুলে যাওয়া সন্তানেরা যেনো এই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে সেই প্রত্যাশায় আজকের আলোচনা।

সন্তান মা-বাবার হাতে আল্লাহর আমানত, তার দেয়া নেয়ামত। এদেরকে সুশিক্ষা দেয়া হল কি না সে বিষয়ে কিয়ামতের দিন পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। কোনো কোনো মা-তো নিজের অজান্তেই সন্তানের মন্দ স্বভাবের কারণ বনে যান। অন্যের খেত থেকে মরিচ, মূলা, আলু ইত্যাদি আনার জন্যে শিশুকে বলেন। এতে করে সন্তান ধীরে ধীরে অন্যায়ের পথে পা বাড়ায়। তাই একজন দায়িত্ববান ও সচেতন মা হিসাবে প্রতিটি পদক্ষেপে সজাগ থাকা অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখতে হবে সন্তানের প্রথম বয়সই তার সংশোধনের উপযুক্ত সময়।

একটি শিশু জন্মের পর থেকেই সাধারণত মায়ের কাছে থাকে। মা-ই তার প্রথম পাঠশালা। তাই সন্তান আদর্শ ও সৎ হওয়ার পিছনে মায়ের ভূমিকাই বেশি। একটি সন্তান পৃথিবীতে কত বড় হবে, কত ভালো হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে মায়ের উপর। সেজন্য সর্বাগ্রে মা-কে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং তা যথার্থভাবে বাস্তবায়নের প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ঐ সময় তাকে যেটা শিক্ষা দেয়া হয় সেটাই সে শিখে নিবে। সন্তানকে শিক্ষা দিতে মায়েরও প্রস্তুতি শুরু হয় সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) জীবনী থেকে নেয়া, প্রথম দিনেই অবাক কান্ড! মক্তবের শিক্ষক হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)কে আউযু বিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ সবক দানের সাথে সাথে হযরত বড় পীর কোরআন মজিদের প্রথম ১৮ পাড়া পর্যন্ত মুখস্ত বলে ফেললেন। মক্তবের শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, হে বৎস! তুমি কিভাবে কোরআন মুখস্ত করেছো! আজ মক্তবে তোমার প্রথম দিন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বলেন, আমার মাতা ১৮ পাড়ার পর্যন্ত কোরআন মুখস্ত করেছিলেন। আমি গর্ভে থাকাকালীন সময় তিনি কোরআন পাঠ করতেন। আমি মায়ের তেলাওয়াত শুনে শুনে ১৮ পাড়া পর্যন্ত মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়ে মুখস্ত করে ফেলেছি।

‘মা’ নামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আলাদা শক্তি। একজন মা মানেই একটি প্রতিষ্ঠান। একটি পৃথিবী এবং তার থেকেও অধিকতর কিছু। রোড একসিডেন্ট করার পর বাবার বিজনেস বন্ধ হয়ে হওয়ায় আর কৃষি কাজের ইনকাম দিয়ে, দেখেছি কীভাবে একজন মায়ের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চালিয়ে নিতে হয় সংসার নামক জাহাজটিকে। এটির মূল চালিকা শক্তি আয়-উপর্জন বাবার হাত ধরে আসলেও চালকের দায়িত্ব তো মাকে-ই পালন করতে হয়। এই অল্প উপার্জনের সংসারে জোরা-তালি দিয়ে দিয়ে। এ কলসির পানি ও কলসিতে ঢেলে সংসারটাকে টেনে টুনে চালিয়ে নেয়ার মন্ত্র জানা থাকে মায়েদের। শত অভাবেও সন্তানদের টের পেতে না দেয়ার চেষ্টায় পালন করেন অভিজ্ঞ অভিনেত্রীর ভূমিকা। অসুস্থ মা-ই নিয়ম করে খবর নেন সুস্থ সবার। কর্মব্যস্ততায় ডুবে থাকা সবার পাশে ভেলার মতো ভেসে থাকেন মা।

আমাদের জীবনে আমাদের মা ই একমাত্র মানুষ যে এক্কেবারে ভেতর থেকে বোঝে, মায়েদের কিছু বলে দিতে হয়না আমাদের, আমাদের মুখ দেখলেই কেমন করে যেন আমাদের মনের অবস্থা বুঝে ফেলে। জীবনে যে মানুষের কাছে তার মায়ের স্নেহ থাকে সে সেই স্নেহ ভালোবাসার জোরে সারা পৃথিবী জয় করতে পারে। যার কাছে মায়ের আশীর্বাদ আছে তার কাছে পৃথিবীর সবথেকে মূল্যবান ধন আছে । স্বার্থ ছাড়া ভালোবাসে শুধু আমাদের মা।

পৃথিবীটা স্বার্থপর। সবাই শুধু নিতে চায়, কেহ দিতে চায় না। একমাত্র মা-ই নিঃস্বার্থভাবে দিয়ে যায়, কিছুই নেয় না। মায়ের ঋণ কোনো দিন শোধ হওয়ার নয়। জনম দুখিনী মা আমাদের মাতৃগর্ভে নিয়ে ১০ মাস ১০ দিন নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করেন। ভূমিষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত মাকে সহ্য করতে হয় কত যে বেদনা, তা শুধু মা-ই বলতে পারে। সেই মাকে যারা অবহেলা করো, মায়ের কষ্ট বোঝো না, তারা স্রষ্টার কাছে সম্মানিত হতে পারবে না।

মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষরা। যদি উদাহরণ দিতে হয়, তবে সবার আগে দিতে হবে, তবে তারআগে গঠনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করে নেই, পড়াশুনার উদ্দেশ্যে হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) ব্যবসায়িক কাফেলার সাথে বাগদাদ যাওয়ার পথে ডাকাতের কবলে পড়েন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ)কে ডাকাত সর্দার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সাথে কি আছে? তিনি বললেন, আমার নিকট ৪০টি স্বর্ণ মুদ্রা আছে। ডাকাত সর্দার আশ্চার্যন্বিত হয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন হে যুবক! তুমি তো মিথ্যা কথা বলে আমার নিকট থেকে স্বর্ণ মুদ্রা লুকাতে পারতে। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বললেন, মিথ্যা কথা বলতে আমার মা নিষেধ করেছেন। তারপর ডাকাত সর্দার ও সাথে আরো ৬০ জন অশ্বারোহী ডাকাতরা ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে ভালো মানুষ হয়ে যায়।

 বায়েজিদ বোস্তামির মাতৃভক্তির কথা। গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে মা পানি খেতে চেয়েছিলেন। সে পানি ঘরের কোথাও না পেয়ে গ্রামের এক কোণে গিয়ে কুয়া থেকে এনেছিলেন বায়েজিদ। এসে দেখেন, মা আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমন্ত মাকে ডাক দিলে মায়ের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটবে; আবার ঘুম থেকে উঠে মা পানি না পেলে মায়ের কষ্ট হবে।সে জন্য তিনি সারা রাত ধরে মায়ের পাশেই পানি হাতে নিয়ে জাগ্রত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলেন। ঘুম থেকে উঠে মা যখন দেখতে পেলেন ছেলে পানি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, ঠিক সে দৃশ্য দেখে মা জোড় হাত তুলে, আল্লাহর দরবারে প্রাণ খুলে দোয়া করলেন। মায়ের দোয়ার বরকতে বায়েজিদ অলি হতে পেরেছিলেন।

এই তো কয়েকদিন আগে সদ্য প্রয়াত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক তার জীবনী বলতে গিয়ে মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলেন। গল্পের ছলে তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষার সময় নাকি তার প্রচণ্ড জ্বর ছিল। তার মা তাকে বলেছিলেন, ‘বাবারে পরীক্ষা দে, পাস করবি।’

আনিসুল হক জ্বর নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকি পরীক্ষাও দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি মাত্র ৩৪ এর উত্তর দিতে পেরেছিলেন। অল্প কিছুক্ষণ পরীক্ষা দেওয়ার পর মায়ের কাছে এসে বলেন, ‘মা পরীক্ষা ভাল হয়নি।’ মা বললেন, ‘বাবারে এসো দু রাকাত নামাজ পড়ে তোমাকে একটা ফুঁ দেই।’

কাকতালীয় হলেও সত্য আনিসুল হক ৩৪ পেয়েছিলেন শুধু মায়ের দোয়ার কারণে। আমরা আরো জানি টমাস আলভা এডিসনের কথা। যে স্থুল বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলেটিকে স্কুল থেকে চিঠি লিখে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে চিঠি উল্টো পড়ে সন্তানকে উৎসাহ দিয়ে মা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনিই টমাস আলভা এডিসনের মা। মায়ের ভালোবাসায় টমাস সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন হতে পেরেছিলেন।

মাকে যারা ভালবাসে না, তারা জীবনেও উন্নতি করতে পারে না। ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতেও মায়ের মর্যাদার কথা উল্লেখ করা আছে। মাকে ভালোবাসার জন্য দিবস লাগে না, লাগে না কোনো অজুহাত। মায়ের বিকল্প পৃথিবীর আর কেউ নেই।

পরিশেষে বলতে চাই –  মসজিদ বানাও, মন্দির বানাও, গির্জা বানাও, পারলে হাসপাতাল ও বিদ্যালয় বানাও কিন্তু কখনো মায়ের জন্যে  বৃদ্ধাশ্রম বানিওনা। নিজের মাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসো এবং সব সময় মায়ের যত্ন নিতে ভুলে যেওনা।

লেখকঃ এম এস হাবিবুর রহমান,  সম্পাদক ও প্রকাশক, নিউজ সমাহার। সিইও, জোনাকি মিডিয়া গ্রুপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *