বৈদেশিক কর্মসংস্থানে করোনার অভিঘাত

মতামত

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক কর্মসংস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতিতে ১. বৈদেশিক কর্মসংস্থান, ২. রফতানিমুখী পোশাক শিল্প এবং ৩. কৃষির অবদান মুখ্য- এ বিষয়টি নতুন করে জানা বা বোঝার প্রয়োজন নেই। বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের যে মহামারী দেখা দিয়েছে, তা থেকে কোনো দেশই মুক্ত নয়।

অর্থ, বিত্ত, বুদ্ধি, প্রযুক্তি, শক্তি, সামর্থ্য কোনো কিছুই এ ক্ষুদ্র অথচ বিধ্বংসী জীবাণুর সঙ্গে পেরে উঠছে না; বরং নতজানু হয়ে পড়েছে। বিশ্বের পরাক্রমশালী দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে এর মোকাবেলা করতে। মানুষের জীবন গেছে থেমে, অর্থনীতি হয়ে পড়েছে স্থবির। ‘লকডাউন’-এর অস্ত্র প্রয়োগ করে মানুষকে ঘরে রাখার কৌশল প্রয়োগ করেও অনেক দেশই এখন তা শিথিল করে অর্থনীতির চাকাকে সচল করার নানাবিধ কর্মপন্থা অবলম্বন করছে। কোভিড-১৯ এর অভিঘাত সব দেশকে পযুর্দস্ত করলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এক মহাচ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। ‘জীবন না জীবিকা’- এ প্রশ্ন সামনে রেখে প্রতিটি দেশই যার যার মতো করে পরিকল্পনা করছে।

আইএলও জানাচ্ছে, কোভিড-১৯ এর অভিঘাতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ১.৬ বিলিয়ন কর্মী কর্মচ্যুত হবেন। The UN Economic and Social Commission for West Asia ধারণা করছে, আরব অঞ্চলগুলোয় ১.৭ মিলিয়ন কর্মী কাজ হারাবেন। অপরদিকে বিশ্বব্যাংক ধারণা করছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ২২ শতাংশ রেমিটেন্স প্রবাহ কম হবে। বাংলাদেশে প্রবাসীদের প্রেরণকৃত ডিসেম্বর ২০১৯-এ রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা এপ্রিল ২০২০-এ দাঁড়িয়েছে ১.০৮ বিলিয়ন ডলারে। এসব পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে সামনের দিনগুলোতে কঠিন সময় আসছে বলে ধারণা করা যায়।

আমরা যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অবস্থা দেখি, তবে দেখা যায়- প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ ভাগ মানুষের কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হয়ে থাকে। অথচ এখন তেলের দর সর্বকালের রেকর্ড পরিমাণ কম মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় তেলের কম মূল্য এবং করোনাকালীন সংকটের কারণে তাদের অর্থনীতিও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এর লক্ষণও বিদেশি কর্মীদের বের করে দেয়ার মাঝ দিয়েই অনুমান করা যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে লক্ষ্য করা গেছে, যেসব কর্মী বিভিন্ন কারণে ‘অনিয়মিত’ হয়ে পড়েছিল, তাদের প্রায় জোর করে স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে; আবার অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করা হচ্ছে না। সঙ্গত কারণেই আগামী দিনগুলোতে বিদেশ ফেরত কর্মীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশকে বিদেশ ফেরত কর্মীদের বিষয়টিকে জরুরি ভিত্তিতে ভাবতে হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের জন্য কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, তারও বিশদ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত ‘বিদেশ ফেরত অভিবাসী কর্মীদের জীবন ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব’ শীর্ষক এক জরিপে উঠে এসেছে, দেশে ফেরার পর ৯১ ভাগ কর্মী কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি। দেশে ফেরত আসা ৫৫৮ জন কর্মীর ওপর এ জরিপ করা হয়। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশ কর্মীর আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই বলে তারা জানিয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও ভীতির মধ্যে রয়েছেন। (সূত্র : প্রথম আলো, ২৩ মে ২০২০)

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে পোশাক শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কৃষির জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিদেশ প্রত্যাগত কর্মীদের জন্য ২০০ কোটি টাকার সফট লোন প্যাকেজ গ্রহণ করেছে। এছাড়া প্রবাসী ব্যাংকের মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকা প্রদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত সমস্যাপীড়িত কর্মীদের সরাসরি সহায়তা প্রদানের জন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে অবস্থিত শ্রম উইং-এ ১০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। বিদেশ প্রত্যাগত কর্মীদের জন্য আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি আরও কিছু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে নয়।

এছাড়া, আগামী অর্থবছরের বাজেটেও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য যুক্তিসঙ্গত পরিমাণে বাজেট বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে এক্ষণি যা করা প্রয়োজন তা হল, বিদেশ প্রত্যাগত সব কর্মী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) আওতাধীন ৬৪টি জেলায় অবস্থিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো কর্মী কোনো কারণে রেজিস্ট্রেশন করতে না পারলে বিএমইটি’র একটি নির্ধারিত ওয়েবসাইটে স্ব স্ব নাম রেজিস্ট্রি করবেন। রেজিস্ট্রেশন করার সময় প্রত্যেক কর্মী বিদেশে যে পদে কাজ করতেন এবং তার অর্জিত দক্ষতা উল্লেখ করবেন। কর্মীরা তাদের নিয়োগকর্তার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বরও উল্লেখ করবেন। এ তথ্য প্রাপ্তির পর প্রত্যেক কর্মীকে স্ব স্ব পেশায় দক্ষতা অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট টিটিসি-তে একটি ‘টেইলর মেইড’ প্রশিক্ষণ প্রদান করে বা আরপিএল (recognition of prior learning) সনদায়ন করা যেতে পারে এবং বিএমইটি’র অধীনে একটি ডাটাবেইস করা যেতে পারে। ভবিষ্যতে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য এ ডাটাবেসকে ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি ডাটাবেস সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসেও প্রেরণ করা যেতে পারে। যেসব দেশে শ্রম উইং রয়েছে সেসব দেশের শ্রম উইং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদেশ প্রত্যাগত কর্মীদের পুনরায় কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবে। উল্লেখ্য, কর্মীদের রেজিস্ট্রেশন এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর সনদ প্রাপ্তি সাপেক্ষে টিটিসি থেকে প্রত্যেক কর্মীকে সরকার প্রতিশ্রুত অর্থ বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। এছাড়া যেসব কর্মী বিদেশে ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা করতেন তাদের জন্য এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদান করে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করারও উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

চলমান করোনা মহামারী এটাও দেখিয়ে দিয়েছে- আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর ও নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হল, প্রতিটি দেশেই স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যাপক স্বল্পতা রয়েছে। ফলে অনুমান করা যায়, আগামী দিনগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মী তথা হেলথ টেকনিশিয়ানদের চাকরির চাহিদা বিশ্বব্যাপী থাকবে। বিশেষত, মেডিকেল ইকুইপমেন্ট টেকনিশিয়ানের চাহিদা এখনও রয়েছে। এক স্টাডি রিপোর্টে দেখা যায়, বায়ো মেডিকেল সেক্টরে সারা বিশ্বে ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এখন থেকেই এসব খাতে প্রশিক্ষিত কর্মী প্রস্তুত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে একটি বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। প্রয়োজন হলে টিটিসি’র অধীনে সারা দেশব্যাপী মেডিকেল টেকনিশিয়ান পদে প্রশিক্ষিত কর্মী প্রস্তুত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিটি জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রশিক্ষণাধীন কর্মীরা ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে যেন আন্তর্জাতিক কারিকুলাম অনুসরণপূর্বক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমেও বৈশ্বিক পর্যায়ে কর্মী গ্রহণকারী দেশগুলোতে কর্মীদের গণহারে ছাঁটাই না করার জন্য কর্মী প্রেরণকারী বিভিন্ন দেশ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া কর্মী প্রেরণকারী দেশগুলোর আঞ্চলিক সংগঠন কলম্বো প্রসেস, কর্মী গ্রহণকারী দেশগুলোর সংগঠন আবুধাবি ডায়লগের (এডিডি) মাধ্যমেও বৈশ্বিক পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

বিভিন্ন সম্ভাব্য দেশে-বিদেশি কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রচারের জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান গৃহীত হতে পারে। ইতোপূর্বে ৫৩টি দেশে পরিচালিত সমীক্ষার প্রতিবেদন এক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। কর্মীদের পুনরায় বিদেশের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এজন্য বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আন্তর্জাতিক সনদায়নের (International certification) এবং গন্তব্যগুলোর দেশগুলোর সঙ্গে সনদপত্রের পারস্পরিক স্বীকৃতি (Mutual recognition) প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আশা করা যায়, করোনার জন্য অন্য পেশায় চাহিদা কমলেও গৃহকর্মীর চাহিদা কমবে না; বরং বাড়বে। কিন্তু এজন্য তাদের অভিবাসন নিরাপদ ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে মহিলা কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা, বিশেষ করে প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসী কর্মীদের প্রতারণা থেকে বাঁচাতে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। সচেতনতামূলক প্রচারের বিষয়েও একটি প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।

করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার কারণে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে যথাযথভাবে পুনরায় সংহত করার লক্ষ্যে কিছু সরাসরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। জাতীয় অর্থনীতিতে অভিবাসী শ্রমিকদের বিশাল অবদান বিবেচনা করে নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়। এগুলো হল-

১. প্রবাসী ও অভিবাসী কর্মীদের সহায়তার জন্য একটি স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ; ২. করোনাভাইরাসজনিত কারণে ফিরে আসা অভিবাসীদের পুনরায় প্রশিক্ষণ, আপ-স্কিলিং এবং পুনঃস্কিলিং প্রশিক্ষণ প্রদান; ৩. যথাযথ চাকরি লাভের জন্য ফেরত আসা অভিবাসীদের বৃত্তিমূলক দিক-নির্দেশনা এবং কর্মজীবনের পরামর্শ প্রদান; ৪. ক্ষুদ্র ব্যবসায় উদ্যোগের জন্য বিভিন্ন ব্যাংককে বিনিয়োগ পণ্যগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ; ৫. পুনর্বাসনের জন্য মাইক্রো-ক্রেডিট প্রদানের জন্য এনজিওগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন; ৬. যৌথ কারবার পরিচালনার জন্য সমবায় অধিদফতরের মাধ্যমে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করা; ৭. ফেরত আসা কর্মীদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য এসএমই-এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা; ৮. Entrepreneurship ও Techno-preneurship-এর মাধ্যমে ফেরত কর্মীদের আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করার উদ্যোগ গ্রহণ; এবং ৯. অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য অভিবাসীদের আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহণ।

এখন থেকেই উপরোল্লিখিত উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা হলে আশা করা যায়, বাংলাদেশ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে করোনার অভিঘাত মোকাবেলায় পিছিয়ে থাকবে না।

কাজী আবুল কালাম : সাবেক যুগ্মসচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

ড. মো. নুরুল ইসলাম : সাবেক পরিচালক, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *