পরিবেশের সুরক্ষায় টেকসই উন্নয়ন

Uncategorized

মানুষের নিরন্তর উন্নয়ন প্রচেষ্টার অন্য নাম হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশের নানান রকম ব্যবহার। পরিবেশ আমাদেরকে সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়। আমরা জানি, প্রাকৃতিক নিয়মেই প্রকৃতি ও পরিবেশ টিকে থাকে। মানুষের উন্নয়ন প্রচেষ্টা যখন এই নিয়ম ভঙ্গের কারণ হয় অথবা নিয়মে বাধা সৃষ্টি করে তখনই পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়, দেখা দেয় বিভিন্ন দূষণ। বাংলাদেশ ক্রমশ উন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। উন্নয়নের পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দূষণও।

বলা যায় বৈশ্বিক প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেকাংশে ধ্বংসের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেকোনো সময় ধ্বসে পড়তে পারে- যার ফল হবে অত্যšত ভয়াবহ ও মারাত্মক। প্রতিনিয়ত বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কারখানা। বিভিন্ন প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে, প্রকৃতি তার নিজস্ব চলনরীতি হারাচ্ছে- যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে পুরো পৃথিবীর মানুষের উপর। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, অন্যদিকে মানুষ তার আদি নিবাস হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা এবং বিশুদ্ধ বাতাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবুও যেন উন্নয়নের ছোঁয়ায় মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় খামখেয়ালী আচরণ করছে। তাদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে উন্নয়ন ও অর্থ।

বর্তমানে একের পর এক বৈশ্বিক সম্মেলন হচ্ছে যেমন- বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে কিয়টো প্রটোকল বা বৈশ্বিক আইন-কানুন কোনো কিছু দিয়েই পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি দেশেই পরিবেশ রক্ষায় একাধিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য কিছু আইন হল- বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, পরিবেশ আদালত আইন, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র আইন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ইত্যাদি। কিন্তু তার পরেও প্রকৃতি তার নিজস্বতা হারাচ্ছে শুধুমাত্র মানুষের অজ্ঞতার ফলে, অসচেতনার ফলে- যার অনেকগুলো উপাদান জুড়ে আছে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্যে।

বর্তমান সময়ের বহুল ব্যবহৃত একটি জিনিস হচ্ছে প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারের পর বিশেষ করে পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিকের বোতল, বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত প্লাস্টিক অধিকাংশই পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন না করে প্রাকৃতিক পরিবেশে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে যা পরিবেশকে মারাত্বক হুমকির সম্মুখিন করে তুলছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাদের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে প্লাস্টিক দূষণে বাংলাদেশ বিশ্বে ১০ম স্থান অধিকার করেছে বলে উল্লেখ করেছেন। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের ২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাটি ও পানিতে ৬৫ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছে। ফলস্বরূপ মাটি ও পানি ক্রমশ দূষিত হচ্ছে- যা জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

ব্রিটিশ কলম্বিয়ার হেলথ ইফেক্ট ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন ২০১৯ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বায়ুদূষণ জনিত মৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। শিল্প, যানবাহন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়ন বায়ুদূষণের কয়েকটি প্রধান কারণ। তবে বায়ুদূষণের বড় দুইটি উপাদান হলো শিল্পকারখানার বর্জ্য ও যানবাহনের ধোঁয়া। ইটের ভাটা, সার কারখানা, চিনি কল, কাগজ কল, পাটকল, বস্ত্র কারখানা, স্পিনিং মিল, ট্যানারী শিল্প, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরী, রাসায়নিক ও ঔষধ শিল্প, সিমেন্ট কারখানা প্রভৃতি শিল্প কারখানা প্রধানত বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ২০০০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সাল পর্যন্ত বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ প্রাক শিল্পযুগের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি এবং বর্তমান পদ্ধতি ও হারে জ্বালানি ব্যবহার অব্যাহত থাকলে পনের বছরের মধ্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। যদি জ্বালানি ব্যবহার আরও বাড়ে তাহলে সেই অনুপাত ৮০ শতাংশে উন্নীত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিশ্বের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির পিছনে শিল্পায়িত উন্নত বিশ্ব দায়ী হলেও এর কুফল উন্নত এবং অনুন্নত সব দেশকেই ভোগ করতে হবে। কেননা জলবায়ু একটি বৈশ্বিক সম্পদ। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, মরুকরণ দ্রুত হারে বাড়তে থাকবে, সমদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে- যা প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। সেই সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আশংকাজনক হাড়ে বেড়ে যাবে এবং এর প্রভাব ইতোমধ্যে প্রকৃতিতে পড়তে শুরু করেছে।

আবার নতুন নতুন ইটভাটা চাষযোগ্য জমি ও উর্বর মাটি নষ্ট করে চলেছে, অন্যদিকে ইট পোড়াতে অনেক কাঠ ব্যবহারের ফলে বনজঙ্গল উজার হচ্ছে। অথচ আমরা জানি, এই বন উজাড়করণের ফল খুবই মারাত্বক। কেননা এর ফলে বৃষ্টিপাত কমে যায়। ফসলি জমির ক্ষতি হয়। বর্তমানে ইট পোড়ানোর ক্ষেত্রে কয়লার ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে- যা নিঃসরণ করছে বিষাক্ত সালফার। বায়ুমন্ডলে মিশে তৈরি করছে গ্যাসের ক্ষতিকর আ¯তরণ- যা এসিড বৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করে।

দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পানি দূষণের হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছে। বিভিন্ন শিল্প কারখানার বর্জ্য পরিশোধনের ক্ষেত্রে ইটিপি ব্যবহার না করে জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নদীতে নির্গত করা তরল বিষাক্তবর্জ্য পানিকে দূষিত করছে প্রতিনিয়ত- যা জলজ বা¯তুসংস্থানের ওপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে। যেখানে প্রতিটি কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র বা ইটিপি থাকা আবশ্যক- সেখানে দেশব্যাপী এরূপ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কারখানার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কারখানায় ইটিপি নেই, আবার যেগুলোতে আছে সেগুলোও অকার্যকর। যা মাটি ও পানি দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুনে।

প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে কাঁচামাল- যা উৎপাদনের পূর্বশর্ত। যার দরুন বিশ্বে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েই চলছে। জাতিসংঘের পরিবেশ সংস্থার গ্লোবাল রিসোর্স আউটলোক অনুসারে, কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ২০৬০ সালে গিয়ে এই হিসাব দাঁড়াবে প্রায় ১৯০ বিলিয়ন টনে- যা পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করবে। অনেক বনভূমি, চাষের জমি নষ্ট হয়ে গেছে মানুষের কারণে। অনেক নদী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদীতে এখন আর আগের মতো গভীরতা দেখা যায়না, নাব্যতা হারাচ্ছে নদীগুলো। জীববৈচিত্র হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে। অনেক প্রজাতি ইতোমধ্যে নিশ্চিন্ন হয়ে গেছে আবার যেগুলো আছে সেগুলোও হুমকির মুখে।

নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে, বাঁচবে দেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি। আমাদেরকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করে কাজ করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অসময়ে বন্যা ও বৃষ্টির কারণে হাওর অঞ্চলের ফসল নষ্ট হচ্ছে। ২০১৮ এর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ২৮ শতাংশই হয়েছে পরিবেশ দূষণজনিত রোগের কারণে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন হুমকির মুখে। বন উজার করে দিন দিন নতুন নতুন ভবনের সংখ্যা বাড়ছে সেখানে। মানুষের বসবাস বাড়ছে। এতে বর্জ্য বাড়ছে। ইঞ্জিন চালিত নৌকার আনাগোনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব নৌকা থেকে নির্গত তেল প্রবালের গায়ে আ¯তরণ ফেলছে। ফলে প্রবালের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

আমরা জানি, টেকসই উন্নয়নের যে চ্যালেঞ্জ গুলো রয়েছে তা হলো উন্নয়নের সস স্তরে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন সৃষ্টি করা, উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও বা¯তবায়নে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা, দক্ষ ও সৃজনশীল জনবল সৃষ্টি করা, সুরক্ষিত এলাকা ছাড়া অন্যত্র বন্যপ্রানী সংরক্ষণ ও ভূ-ব্যবস্থাপনা সুসংহত করা, নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কার্যকাঠামো সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যভান্ডার সৃষ্টি করা।

কোনো দেশের উন্নয়নের জন্য সে দেশে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের প্রয়োজন হয়। যার প্রতিকূল প্রভাব স্বভাবতই পরিবেশের উপর পড়ে। পরিবেশের কথা মাথায় রেখে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। বেশি বেশি সামজিক বনায়ন তৈরি করতে হবে, পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা, যানবাহন ও শিল্পকারখানা তৈরি করতে হবে। ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার কমাতে হবে। প্রতিটি শিল্পকারখানার সঙ্গে শোধনাগার বা অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব প্রযুক্তির উপরে ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। ঢাকা শহরে অনেক পতিত জমি আছে সেখানে গাছ লাগানো যেতে পারে।

বিশেষ করে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য যেখানে সেখানে না ফেলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হবে। তাছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করে আমরা তা আবার ব্যবহার করতে পারি। তাহলেই তা বর্জ্য আকারে নদীতে পতিত হবে না। ফলে নদী ভরাট কমে আসবে অনেকাংশে। জাতীয়ভাবে পরিবেশ রক্ষার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত, সচেতন হওয়া উচিত। সর্বোপরি, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বা¯তবায়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাঁচাতে হবে প্রকৃতিকে, রক্ষা করতে হবে পরিবেশের সামগ্রিক উপাদান। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, সকল উন্নয়নের মূলে রয়েছে পরিবেশ। তাই আমাদেরকে সর্বপ্রথম পরিবেশের সুরক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। পরিবেশ এবং পরিবেশের উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা মানবজাতিকেই করতে হবে। সেই সাথে টেকসই উন্নয়নের নীতিমালাগুলো মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। পরিবেশকে বিনষ্ট করে কখনোই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

লেখক- নাজমুন্নাহার নিপা : শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *