কী হবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের?

মতামত

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার বহু আগে থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের কথা লোকমুখে শুনেছি।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক অথবা অযৌক্তিক দাবিতে, রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক অশান্ত পরিবেশে তোপের মুখে পড়ে মাসের পর মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকত। এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভাইয়া-আপুদের কাছ থেকে শুনতাম তাদের সেশন জটের গল্প। এখন বিভিন্ন বিভাগে যৎসামান্য সেশন জট থাকলেও ক্যাম্পাস ভায়োলেন্স কমেছে। কিন্তু আজ আমরা যেন এক অথৈ দরিয়ার মধ্যে পড়েছি।

সারা পৃথিবীর সুনীল আকাশ করোনা নামক ভাইরাসের কবলে পড়ে নিকষ কালো রূপ ধারণ করায় গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষের জীবন প্রবাহ সীমিত হয়ে গেছে। রূপকথার গল্পের রাক্ষসের হাত থেকে পালিয়ে যেমন মানুষ নির্জন গুহায় লুকাত, অনুরূপভাবে এই ভাইরাসের কবল থেকে রক্ষা পেতে মানুষ আজ গৃহবন্দি।

ফলে দেশের শিল্প-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও শিক্ষাসহ জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত সব সেক্টরে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। প্রতিদিন সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার কবর খনন করা হচ্ছে; তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনও করোনায় খারাপ কিছুই হয়নি! করোনার প্রভাবে পৃথিবীবাসী হয়তো আরেকটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর অর্থাৎ ব্যাপক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কবে নাগাদ আমরা এ ভাইরাস থেকে মুক্তি পাব, তা কেউ জানে না।

এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কোনো অংশে কম নয়। শিক্ষার্থীরা আগামীর ভবিষ্যৎ, জাতির মেরুদণ্ড। পাঠ গ্রহণ ও পাঠদান ছাড়া এ মেরুদণ্ডের কোনোই অস্তিত্ব নেই।

ইতোমধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষা স্থগিত করে দেয়া হয়েছে এবং কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। তাদের একাডেমিক পাঠদানের নেই কোনো বিকল্প পরিকল্পনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চোখে থাকে রঙিন জীবনের স্বপ্ন, কাঁধে থাকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব। তাদের ভবিষ্যতের কী হবে? হাজারও শিক্ষার্থী দ্রুত একাডেমিক পাঠ চুকিয়ে জীবন ও জীবিকার যুদ্ধে নামার স্বপ্ন দেখছিল; কিন্তু থমকে গেছে তাদের পাঠ গ্রহণ। সাধারণত রমজানের এক মাস ছুটি থাকে। সে হিসেবেই কোর্স শেষ করা ও পরীক্ষা গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ বছর রমজানের এক মাস আগেই ক্যাম্পাস বন্ধ; তা-ও অনির্দিষ্টকালের জন্য। তাহলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বড় একটা সেশন জটে পড়বে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তার প্রদেশের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের করোনার পরিপ্রেক্ষিতে বিনা পরীক্ষায় দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আমাদের দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলেই বোর্ড পরীক্ষাগুলো বাদ রেখে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান শিক্ষার্থীদের বিনা পরীক্ষায় পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার ঘোষণা দিতেই পারে। অবশ্য স্বল্পপরিসরে হলেও তাদের জন্য অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে ভিডিও রেকর্ডিং ক্লাস চালু করা হয়েছে। দেশের শীর্ষ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ ইতোমধ্যে অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। বহির্বিশ্বে চীন, ইরান, ইতালি তাদের দেশের শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বরং সব শিক্ষার্থীকে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে একাডেমিক পাঠদান আরম্ভ করছে।

কিন্তু আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সে ধরনের কোনো ব্যবস্থাপনা কিংবা পরিকল্পনা কোনোটাই দেখা যাচ্ছে না। অথচ আমরা কথায় কথায় ডিজিটাল দেশের নাগরিক বলে গর্ববোধ করি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ও আয়তন নিয়ে গর্বিত; কিন্তু এই ক্রান্তিলগ্নে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মহামূল্যবান সময় যে নষ্ট হচ্ছে, সে বিষয়ে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। কেননা, স্বাভাবিক নিয়মে রমজানের ছুটির পরেই ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। করোনা পরিস্থিতি আমাদের কোনদিকে নিয়ে যাবে, তার কোনো কূলকিনারা নির্ধারণ করা এ মুহূর্তে অসম্ভব। তাই অতি দ্রুত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অনুরোধ করছি।

আবদুর রউফ সালাফী, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

salafi12016@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *